
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে আবারও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর ঝুঁকি। স্বাস্থ্য বিভাগের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, নগরীর প্রতি চারটি বাড়ির একটি থেকে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে জরিপে অন্তর্ভুক্ত সব ওয়ার্ডেই এডিসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের জন্য ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের উদ্যোগে পরিচালিত জরিপে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে, অর্থাৎ প্রায় ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেঙ্গুর ঝুঁকি নির্ধারণে ব্যবহৃত কনটেইনার ইনডেক্স ১০ শতাংশের নিচে থাকাকে নিরাপদ ধরা হলেও চট্টগ্রামে এ হার পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। এছাড়া ব্রেটো ইনডেক্স ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যা স্বাভাবিক মাত্রা ২০ শতাংশের অনেক বেশি। পরিদর্শনের সময় ১১৪টি পজিটিভ কনটেইনারে এডিস মশার লার্ভা শনাক্ত করা হয়েছে।
জরিপে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডেই এডিস মশার উপস্থিতি মিললেও উত্তর কাট্টলী (ওয়ার্ড-১০), পাহাড়তলী (ওয়ার্ড-৩), আলকরণ (ওয়ার্ড-২), পশ্চিম বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৭), দক্ষিণ বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৯), দক্ষিণ বালুচরা (ওয়ার্ড-৩৯), পাথরঘাটা (ওয়ার্ড-৩৪) এবং আন্দরকিল্লা (ওয়ার্ড-৩২) ওয়ার্ডকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শনাক্ত হওয়া এডিস মশার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপটাই, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক। বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এডিস এলবোপিকটাস, যা ডেঙ্গুর দ্বিতীয় প্রধান বাহক হিসেবে পরিচিত।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগ বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—টব, টায়ার, ড্রাম, পাত্র বা আঙিনায় তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে না দেওয়া, বাসাবাড়ি ও কর্মস্থল নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, প্লাস্টিকের পাত্র অপসারণ, নির্মাণাধীন ভবন ও আন্ডারগ্রাউন্ড এলাকায় বিশেষ নজরদারি, সময়মতো লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালনা এবং সূর্যোদয়ের পর ও সূর্যাস্তের আগে মশক নিধন অভিযান জোরদার করা। পাশাপাশি কার্যকর কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, দ্রুত সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস এবং কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ডেঙ্গু সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।
গত ৮ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত চার সদস্যের একটি দল স্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহর নেতৃত্বে ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে’ পরিচালনা করে। পরে প্রতিবেদনটি বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছে জমা দেওয়া হয়।
মো. মফিজুল হক শাহ বলেন, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে জনগণের সচেতনতার বিকল্প নেই। বাসাবাড়ির আঙিনা, ফুলের টব, বিভিন্ন পাত্র, নারিকেলের খোসাসহ যেখানে পানি জমতে পারে, সেসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার রাখলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বি জানান, জরিপের ফলাফল ও সুপারিশ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ, মাইকিংসহ প্রচারণা চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এবার আগেভাগেই জরিপ সম্পন্ন করায় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। হাসপাতালগুলোকে পর্যাপ্ত স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং চিকিৎসক ও নার্সদেরও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রচলিত রাসায়নিকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বিটিআই ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশক নিধনে বিশেষ অভিযান ও নিয়মিত মনিটরিং চলছে। তবে তিনি বলেন, শুধু সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাসা, ছাদবাগান, এসি ও ফ্রিজের ট্রেতে পানি জমতে না দিয়ে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে। এতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ আরও কার্যকর হবে।