রাজধানীতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, যা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। অল্পবয়সি এসব কিশোরের অপরাধপ্রবণতা ও নৃশংসতা অনেক ক্ষেত্রে থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে বিপুলসংখ্যক সদস্য গ্রেফতার হলেও তাদের দৌরাত্ম্য কমছে না। বয়সজনিত আইনি সুবিধার কারণে গ্রেফতারের পর অল্প সময়েই জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা।
১৪ থেকে ২০ বছর বয়সি এসব কিশোর গ্যাং সদস্য চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের মতো নানা অপরাধে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে তারা খুনোখুনিতেও অংশ নিচ্ছে। তাদের হাতে চাপাতিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি পিস্তল ও রিভলবারের মতো আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব গ্যাংয়ের পেছনে রয়েছে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণ। একাধিকবার গ্রেফতার হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে তারা আবারও গ্যাং কার্যক্রমে সক্রিয় হয়ে উঠছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত প্রায় ২০ মাসে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ ১৫ এপ্রিল রাতে খুন হন আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুল। এর আগে নিহত হন ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রাজধানীতে ৫২টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল, যেখানে সদস্য সংখ্যা ছিল ৬৮২ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন বিভাগে গ্যাং বিস্তার লাভ করে। মিরপুর বিভাগে সর্বোচ্চ ১৩টি গ্যাং ও ১৭২ জন সদস্য ছিল। ২০২৫ সালে ডিএমপির সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে সক্রিয় গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৮-এ। এর মধ্যে মিরপুর বিভাগে সর্বোচ্চ ৩২টি গ্যাং রয়েছে, যার মধ্যে পল্লবী থানায় ১৪টি। তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি গ্যাং, যার মধ্যে মোহাম্মদপুর এলাকায় ১৬টি সক্রিয়। এছাড়া রমনা, লালবাগ, ওয়ারী, মতিঝিল, গুলশান ও উত্তরা বিভাগেও গ্যাং কার্যক্রম বিস্তৃত।
অন্যদিকে র্যাব ২০২৪ সালে রাজধানীতে ৮০টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং চিহ্নিত করে। একই সময়ে গোয়েন্দা পুলিশ শতাধিক গডফাদারের তালিকা তৈরি করে, যেখানে সিটি করপোরেশনের ২১ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নামও উঠে আসে। গত তিন বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে গ্যাং বেড়েছে ৩২টি এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বেড়েছে ৩৮টি। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে বৃদ্ধির হার ৬৫ শতাংশের বেশি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাং কার্যক্রম সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে। পাঁচটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ থানার প্রায় প্রতিটি এলাকায় গ্যাং বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রভাবশালীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব গোষ্ঠীর পেছনে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে। ডিএমপির তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মোহাম্মদপুরে সক্রিয় ১৭টি বড় অপরাধী দলের মধ্যে অন্তত ৬টির সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। পাশাপাশি কিছু গ্যাং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণেও পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, পারিবারিক নজরদারির অভাব, সামাজিক অবক্ষয় এবং নেতিবাচক ‘হিরোইজম’ প্রবণতা কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। সংঘবদ্ধ শক্তিকে তারা ইতিবাচকভাবে ব্যবহার না করে অপরাধমূলক কাজে লাগাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে শুধু গ্রেফতারই সমাধান নয়, তাদের পুনর্বাসনও জরুরি।
সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, পরিবার, বন্ধুবৃত্ত ও সামাজিক পরিবেশের সম্মিলিত প্রভাবেই কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই পরিবার থেকেই নজরদারি বাড়ানো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। যেসব কিশোর অভিভাবকবিহীন, তাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
আইনি দিক থেকে দেখা যায়, অধিকাংশ কিশোর গ্যাংয়ের মামলা জামিনযোগ্য হওয়ায় দীর্ঘসময় তাদের আটক রাখা সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীর অভাবেও বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশুদের জন্য পৃথক আদালত গঠন করলে এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, কিশোর গ্যাং সমস্যা এখন একটি গুরুতর সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। এর সমাধানে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়