দেশজুড়ে প্রতারণার জাল দিন দিন বিস্তৃত হয়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি সেই প্রযুক্তিকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। অনলাইন থেকে অফলাইন—সবখানেই নতুন নতুন কৌশলে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে তারা। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আর সচেতনতার অভাবে অনেক ভুক্তভোগী প্রতিকার পাওয়ার পথও খুঁজে পান না।
বর্তমানে প্রতারণা আর কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এমনকি সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমেও মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। প্রতারকরা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল বদলাচ্ছে, যাতে সহজে শনাক্ত করা না যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রতারণার পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক, যেখানে একাধিক ব্যক্তি বা চক্র সমন্বিতভাবে কাজ করে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—প্রতারিত হওয়ার পরও অনেকেই লজ্জা, ভয় বা অজ্ঞতার কারণে অভিযোগ করেন না, ফলে প্রতারকরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সম্প্রতি সেনা কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয়ে প্রতারণার প্রবণতা বেড়েছে। হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ফোন করে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো হয়। অনেক সময় বলা হয়, তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে পাসওয়ার্ড, ওটিপি বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হয়। এ বিষয়ে Inter-Services Public Relations (আইএসপিআর) সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, কোনো সরকারি সংস্থা এভাবে ব্যক্তিগত তথ্য বা অর্থ দাবি করে না।
চাকরি বা পদায়নের নামেও প্রতারণা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। ওসি পদায়ন বা সরকারি চাকরির নিশ্চয়তার কথা বলে প্রতারকরা মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। Dhaka Range Police-এর তথ্যমতে, এ ধরনের প্রতারণায় অনেকেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন, তবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী আইনি পদক্ষেপ নিতে দ্বিধায় থাকেন।
প্রতারক চক্রগুলো এখন দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেও টার্গেট করছে। তাদের নামে সিম নিবন্ধন করে সেই সিম দিয়ে প্রতারণা চালানো হচ্ছে। এতে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যায়, আর নিরীহ মানুষ আইনি জটিলতায় পড়ে। Criminal Investigation Department (সিআইডি)-এর তদন্তে জানা গেছে, কিছু প্রতারক ভিক্ষুকদের সরকারি সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে সিম ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করে এবং পরে তা প্রতারণায় ব্যবহার করে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় ই-কমার্স খাত দ্রুত বিস্তৃত হলেও এর সুযোগ নিচ্ছে প্রতারকরা। ভুয়া অনলাইন দোকান খুলে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, অস্বাভাবিক কম দাম এবং চটকদার অফারের মাধ্যমে ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে। প্রথমে অল্প টাকা বুকিং হিসেবে নেওয়া হয়, পরে নানা অজুহাতে আরও অর্থ দাবি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পণ্য সরবরাহ করা হয় না বা নিম্নমানের পণ্য দেওয়া হয়। অভিযোগ করলেও প্রতারকদের খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
মানবিক সংকটকেও ছাড় দিচ্ছে না এই চক্রগুলো। কিডনি রোগী বা গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের বিদেশে চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়ের ঘটনা বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিদেশে নিয়ে গিয়ে জিম্মি করে টাকা আদায় করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এসব প্রতারণা আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়েও প্রতারণা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রতারকরা আকর্ষণীয় অফিস ও সাজসজ্জার মাধ্যমে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। এরপর ধাপে ধাপে অর্থ নিয়ে একসময় গা-ঢাকা দেয়। কখনো কখনো ভুক্তভোগীদের বিদেশে পাঠানো হলেও প্রতিশ্রুত কাজ না দিয়ে অন্য কাজে বাধ্য করা হয়।
পুরোনো কৌশলেও নতুন রূপে প্রতারণা চলছে, যার মধ্যে ‘নাইজেরিয়ান স্ক্যাম’ অন্যতম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্ব গড়ে তুলে বিদেশি পরিচয়ে দামি উপহার পাঠানোর কথা বলা হয়। পরে বিমানবন্দরের কাস্টমসের নামে শুল্ক ও ঘুষ বাবদ টাকা দাবি করা হয়। টাকা দেওয়ার পরও কোনো উপহার পাওয়া যায় না। Hazrat Shahjalal International Airport-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে শতাধিক মানুষ এ প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতারণা প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। কোনো প্রলোভন বা অস্বাভাবিক প্রস্তাব পেলে তা যাচাই করা জরুরি। অনলাইন কেনাকাটায় সতর্ক থাকা, পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করা এবং সন্দেহজনক লেনদেন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
সবশেষে বলা যায়, প্রতারক চক্রগুলো প্রযুক্তি ও মানুষের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন ফাঁদ তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে ব্যক্তিগত সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত অভিযোগ করা এবং অন্যদের সতর্ক করাই পারে এই ভয়াবহ জাল ছিন্ন করতে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহারযোগ্য নহে