মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়—রিজিক, আয়ু, কর্ম এবং সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য—ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী মাতৃগর্ভে থাকাকালেই নির্ধারিত হয়ে যায়। এই চারটি বিষয় মানুষের জীবনধারা, চিন্তা ও কর্মপদ্ধতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ নিজের চেষ্টা-প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকবে; বরং এই বিশ্বাস মানুষকে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে এবং সঠিক পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে।
প্রত্যেক মানুষের রিজিক পূর্বনির্ধারিত। এর মাধ্যমে মানুষকে অলস হয়ে বসে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়নি, বরং পরিতুষ্টি অর্জনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত লোভ, অযথা দুশ্চিন্তা কিংবা সীমাহীন সম্পদের পেছনে অন্ধ দৌড় থেকে বিরত থাকা উচিত। চেষ্টা করা অবশ্যই জরুরি, তবে যা অর্জিত হয়, তাতে সন্তুষ্ট থাকা এবং না পাওয়া নিয়ে হতাশ না হওয়াই উত্তম। যখন একজন মানুষ বিশ্বাস করে যে তার রিজিক নির্দিষ্ট, তখন সে অযথা উদ্বেগ থেকে মুক্ত থাকতে পারে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে শেখে।
মানুষের আয়ুও নির্দিষ্ট। কেউ এক মুহূর্ত বেশি বা কম বাঁচতে পারে না। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময় এসে গেলে তা এক মুহূর্তও আগানো বা পেছানো যায় না। তাই কারও মৃত্যু হলে সেটিকে আল্লাহর ফয়সালা হিসেবে মেনে নেওয়াই ঈমানের অংশ। তাকদিরে বিশ্বাস ছাড়া ঈমান পূর্ণতা পায় না। জীবনের প্রতিটি ঘটনা—ছোট কিংবা বড়—সবই আল্লাহর নির্ধারণ অনুযায়ী ঘটে থাকে। এই বিশ্বাস মানুষের মনে প্রশান্তি এনে দেয় এবং আখেরাতের মুক্তির পথ সুগম করে।
তাকদির আল্লাহতায়ালার এক গভীর রহস্য, যার প্রকৃত জ্ঞান একমাত্র তাঁর কাছেই রয়েছে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত আলোচনা বা অনুসন্ধান মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই এ নিয়ে সীমা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, আল্লাহ নিজ হিকমতে তাকদিরের জ্ঞান মানুষের কাছ থেকে গোপন রেখেছেন। বলা হয়ে থাকে, জান্নাতে প্রবেশের পরই এই রহস্য উন্মোচিত হবে।
মাতৃগর্ভে থাকাকালেই মানুষের কর্ম ও তার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের বিষয়টিও নির্ধারিত হয়। যার আমল ভালো, সে জান্নাতের অধিকারী হবে, আর যার আমল মন্দ, সে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে। কোরআনে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহকে তাদের প্রতিপালক বলে স্বীকার করে এবং সেই বিশ্বাসে অটল থাকে, তাদের কোনো ভয় বা দুঃখ থাকবে না; তারা হবে জান্নাতবাসী।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—শুধু আমলই মুক্তির একমাত্র মাধ্যম নয়। হাদিসে এসেছে, কেউ নিজের আমল দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, বরং আল্লাহর রহমতই মূল কারণ। এর অর্থ এই নয় যে আমলের প্রয়োজন নেই; বরং সৎকর্ম আল্লাহর রহমত লাভের একটি মাধ্যম। আল্লাহর তাওফিক ছাড়া কোনো ভালো কাজই করা সম্ভব নয়।
মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্তের আমল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে উল্লেখ আছে, কখনো কখনো মানুষের পূর্বের আমলের সঙ্গে তার শেষ সময়ের আমলের ভিন্নতা দেখা যায়, আর শেষ সময়ের আমলই তার পরিণতি নির্ধারণ করে। তাই সারা জীবন সৎ পথে থাকার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত সেই পথে অটল থাকা অত্যন্ত জরুরি।
এই কারণে আত্মগর্ব বা আত্মতুষ্টি পরিহার করে সবসময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত, যেন তিনি আমাদের অন্তরকে সঠিক পথে স্থির রাখেন। নবী করিম (সা.) নিজেও নিয়মিত দোয়া করতেন: “হে অন্তরগুলোর পরিবর্তনকারী! আপনি আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।”
তাকদিরে বিশ্বাস মানুষকে জীবনের অনিশ্চয়তার মাঝেও স্থিরতা ও শান্তি দেয়। এটি মানুষকে পরিশ্রম করতে, কিন্তু ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন না হতে শেখায়। একই সঙ্গে সৎকর্মে অবিচল থাকা এবং আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভর করাই একজন মুমিনের প্রকৃত পথ।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়