
বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নাম চাওয়া হয়েছে। নাম পাওয়ার পরপরই বোর্ড গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুর রহমান তরফদার।
শ্রম আইন অনুযায়ী, চার সদস্যের এই বোর্ডে থাকবেন একজন চেয়ারম্যান, একজন নিরপেক্ষ সদস্য, একজন মালিক প্রতিনিধি ও একজন শ্রমিক প্রতিনিধি। বোর্ড গঠনের গেজেট শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব রোববার গণমাধ্যমকে বলেন, গত ১৫ অক্টোবর মালিক প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন এবং শ্রমিক প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে নাম চাওয়া হয়েছিল। তবে রোববার পর্যন্ত শ্রমিক ও মালিকপক্ষের কাছ থেকে নাম পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
বোর্ড কবে গঠন করা হতে পারে—এমন প্রশ্নে সচিব বলেন, নাম পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে দ্রুত অনুরোধ করা হয়েছে। নাম পাওয়া মাত্রই বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ সময় উপস্থিত শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সরকার বোর্ড গঠনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। নাম পেলেই পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা হবে। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সোমবারের মধ্যে নাম পাওয়া গেলে মঙ্গলবারের মধ্যেই বোর্ড গঠনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সদস্য সচিব রাইসা আফরোজ জানান, শ্রম আইনের ১৩৮ ধারা অনুযায়ী চেয়ারম্যান, নিরপেক্ষ সদস্য, মালিক প্রতিনিধি ও শ্রমিক প্রতিনিধিকে নিয়ে মূল বোর্ড গঠন করা হবে।
তবে তৈরি পোশাকশিল্পসহ নির্দিষ্ট কোনো খাতের মজুরি নিয়ে আলোচনার সময় সংশ্লিষ্ট খাতের একজন মালিক প্রতিনিধি ও একজন শ্রমিক প্রতিনিধি বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত হবেন। বর্তমানে নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন সিনিয়র জেলা জজ শেখ আশফাকুর রহমান।
শ্রম আইনের ১৩৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো শিল্পের মালিকপক্ষ, শ্রমিকপক্ষ অথবা উভয় পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ওই শিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। নির্দিষ্ট শিল্পের মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা বোর্ডের সঙ্গে কাজ করেন।
মজুরি বোর্ডে শ্রমিক প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল শ্রম অধিদপ্তর।
শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন রোববার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে জানান, শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে তিনজনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। তাঁরা সবাই শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় নেতা।
প্রস্তাবিত ব্যক্তিরা হলেন—দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুল করিম, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক কহিনুর মাহমুদ এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান সোমবার গণমাধ্যমকে জানান, তৈরি পোশাকশিল্পের মজুরি বোর্ডের মালিক প্রতিনিধি হিসেবে তিনজনের নাম এবং সব শিল্পের জন্য স্থায়ী প্রতিনিধির নাম ফেডারেশনের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া হয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে মঙ্গলবার জাতীয় ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। সেখানে মজুরি বোর্ড গঠন, শ্রম বিধিমালা প্রণয়ন এবং সাম্প্রতিক শ্রম পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি সরকারি পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। কয়েক দিন আগে ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন তৈরি পোশাকশ্রমিকদের একটি অংশ।
শ্রমিকদের ভাষ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
চলতি বছর শ্রম আইন সংশোধন করে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে।
তৈরি পোশাকশিল্পে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে। পরের মাস থেকে কার্যকর হওয়া ওই মজুরিকাঠামোয় শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। এতে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। একই সঙ্গে আগের সাতটি গ্রেড কমিয়ে পাঁচটি করা হয়।
নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পর বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর শ্রমিক ও মালিকপক্ষের।