
দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকটে টেক্সটাইল, ডাইং, ফিনিশিংসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। গতকাল দুপুর থেকে কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও ময়মনসিংহের ভালুকা ও গাজীপুরের শ্রীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক হয়নি।
শিল্পমালিকরা গত ২০ দিনের এই সংকটকে ‘নজিরবিহীন’ ও ‘অস্বাভাবিক’ বলে উল্লেখ করছেন। তাদের দাবি, গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে বাড়তি খরচের পাশাপাশি ভবিষ্যতের ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
এদিকে সরকার জানিয়েছে, চলমান জ্বালানি সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। সংকট নিরসনে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ সক্ষমতা ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে, যা মোট চাহিদার প্রায় ২৬ থেকে ২৯ শতাংশ।
এই ঘাটতি পূরণে বিদেশ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করা হয়। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউর মাধ্যমে আমদানি করা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
তবে গত ২১ জুলাই আগুনের ঘটনায় একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। পরে টার্মিনালটি চালু হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে শুধু এফএসআরইউর ত্রুটি দায়ী নয়। দেশের পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র বা কূপ থেকে পর্যাপ্ত উৎপাদন যুক্ত না হওয়াও সংকটের অন্যতম কারণ।
দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে কয়েক বছর ধরে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩০ শতাংশ এলএনজি এবং ৭০ শতাংশ দেশীয় উৎস থেকে আসে বলে জানিয়েছেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
তার হিসাবে, দেশীয় উৎস থেকে ৭০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহে বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও ৩০ শতাংশ এলএনজি আমদানিতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। ফলে এলএনজিনির্ভরতা একদিকে ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতাও তৈরি করছে।
এ ছাড়া ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্যাসনির্ভর টেক্সটাইল, নিটওয়্যার, ডাইং ও ফিনিশিং শিল্প। কোথাও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে, আবার কোথাও সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন হচ্ছে।
শিল্পমালিকদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু বর্তমান ক্ষতিই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় ভবিষ্যতের অর্ডারও হারাতে হতে পারে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, চলমান জ্বালানি সংকট সমাধানে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগতে পারে। তার মতে, নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করতেই দেড় থেকে দুই বছর সময় প্রয়োজন।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন গ্যাস অনুসন্ধান না হওয়ায় এখন নতুন করে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কোন ধরনের জ্বালানি কত পরিমাণ প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, দীর্ঘমেয়াদে শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
তিনি সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের বিডিং প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা এবং পুরোনো কূপ থেকে পাওয়া গ্যাস দ্রুত গ্রিডে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে শিল্পে জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার বাড়াতে হবে। গ্যাসচালিত বয়লারের পরিবর্তে ইলেকট্রিক বয়লার, যানবাহনে তেলের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং বাসাবাড়িতে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ বা এলপিজির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
সেচের ক্ষেত্রেও ডিজেলের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অবৈধ গ্যাস সংযোগ ও শিল্পকারখানায় অননুমোদিতভাবে গ্যাস ব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।