বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর এক নম্বর ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি সংযোজন কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা দেশের জ্বালানি খাতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই জ্বালানি সংযোজন কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া থেকে দেশে আনা ইউরেনিয়াম সংযোজন উপাদানগুলো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে রিয়্যাক্টরে প্রবেশ করানো হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী বিশ্বের ৩৩তম দেশে পরিণত হলো।
প্রকল্প এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে দূরসংযোগের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানান রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি, যিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর মহাপরিচালক। তিনি এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এছাড়া রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রসাটম-এর প্রধান এলেক্সি লিখাচভ ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে রূপপুর প্রকল্পে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে। উন্নত প্রযুক্তি ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালিত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়িয়ে কেন্দ্রটির পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করা হবে।
দুটি ইউনিট নিয়ে গঠিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করবে।
বাংলাদেশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নতুন নয়। ১৯৬১ সালে প্রথমবারের মতো এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। রূপপুরে জমি অধিগ্রহণের পর তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। স্বাধীনতার পর আবার নতুন করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে পারমাণবিক শক্তিকে সম্ভাবনাময় বিকল্প উৎস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তির আওতায় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ার প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট-এর মধ্যে নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মধ্যে নির্মাণকাজ, যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও স্থাপন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পরিচালনার প্রস্তুতি, জনবল প্রশিক্ষণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈচিত্র্য আসবে, আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পাশাপাশি শিল্পায়ন ও জীবনমান উন্নয়নে এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলেও তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়