রাজধানী ঢাকা শহরকে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন এবং পরিবেশবান্ধব ‘ক্লিন অ্যান্ড গ্রিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এই পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নগর ব্যবস্থাপনা, সবুজায়ন এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনগুলোকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। এসব স্টেশনকে ল্যান্ডস্কেপিং ও গ্রাফিতির মাধ্যমে নান্দনিক রূপ দেওয়ার কাজ চলছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অধীনে থাকা মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে একটি সমন্বিত সার্কুলার ইকোনমি ভিত্তিক কেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে। কোরিয়ান বিনিয়োগে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও সার উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, ভবিষ্যতে ঢাকাকে ‘জিরো বর্জ্য’ বা বর্জ্যহীন নগরীতে পরিণত করা।
ঢাকাকে সবুজে ঢেকে দেওয়ার অংশ হিসেবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে জাপানিজ ‘মিয়াওয়াকি’ পদ্ধতিতে নগর বনায়ন শুরু হয়েছে। দ্রুত বর্ধনশীল এই পদ্ধতিতে ঘন সবুজ বন তৈরি করা সম্ভব হয়।
আগামী পাঁচ বছরে শুধুমাত্র উত্তরে ৫ লাখ এবং সারাদেশে মোট ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের খালি জায়গাগুলোতেও সবুজায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া ‘জিরো সয়েল’ কর্মসূচির মাধ্যমে সড়কের খোলা মাটি ঘাস ও লতাগুল্ম দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে, যাতে ধুলাবালি ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় দূষণের প্রধান উৎসগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
২৫০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা পরিবহন খাতের কার্বন নিঃসরণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
নির্মাণকাজ থেকে সৃষ্ট ধুলা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ঢাকার পার্শ্ববর্তী সাভার অঞ্চলকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করে সেখানে খোলা স্থানে বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ঢাকার চারপাশের নদী ও খালের দূষণ রোধে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও অন্যান্য জলাশয় পুনরুদ্ধারে কাজ চলছে। ইতোমধ্যে ২৪৮টি শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইটিপি (Effluent Treatment Plant) স্থাপন নিশ্চিত করা হয়েছে।
এসব ইটিপির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা হিসেবে আইপি ক্যামেরা স্থাপনের কাজও চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, সব সুযোগ-সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় শহরটির ওপর জনসংখ্যা ও পরিবেশগত চাপ বাড়ছে। এই চাপ কমাতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পায়ন, উন্নত চিকিৎসা ও শিক্ষা সুবিধা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
এর ফলে মানুষ নিজ নিজ এলাকায় কর্মসংস্থান ও মৌলিক সেবা পেলে ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া খুলনার দাকোপসহ উপকূলীয় অঞ্চলে নদীভাঙন রোধে টেকসই বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পও চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
সব মিলিয়ে সরকারের লক্ষ্য হলো ঢাকাকে শুধু একটি আধুনিক নগরী নয়, বরং পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং বাসযোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তোলা।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়