1. info@www.media71bd.com : NEWS TV : NEWS TV
  2. info@www.media71bd.com : TV :
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫০ অপরাহ্ন

ভয়াল ২৯ এপ্রিল: ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত বাংলাদেশের উপকূল

ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

আজ ২৯ এপ্রিল—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন। ১৯৯১ সালের এই দিনে সংঘটিত হয় দেশের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা পরবর্তীতে ১৯৯১ বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় নামে পরিচিতি পায়। এই ঘূর্ণিঝড় শুধু প্রাণহানির দিক থেকেই নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকেও এক গভীর ক্ষত রেখে গেছে।

১৯৯১ সালের এপ্রিলের শেষদিকে সৃষ্ট এই শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়টি ক্রমে তীব্র আকার ধারণ করে এবং ২৯ এপ্রিল রাতের দিকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে আঘাত হানে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৫০ কিলোমিটার, যা এটিকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত করে। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস, যা উপকূলীয় নিম্নাঞ্চলগুলোকে মুহূর্তেই পানির নিচে তলিয়ে দেয়।

ঘূর্ণিঝড়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে উপকূলীয় দ্বীপ ও নিম্নাঞ্চলগুলোতে। বিশেষ করে সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, খেপুপাড়া, ভোলা এবং টেকনাফ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটে। জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ভেসে যায় অসংখ্য বসতবাড়ি, গবাদিপশু এবং জীবিকার প্রধান উৎস কৃষিজমি। লবণাক্ত পানির কারণে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসল উৎপাদন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। তবে বিভিন্ন বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অনানুষ্ঠানিক অনুমান অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা দেড় লাখের কাছাকাছি হতে পারে। প্রায় এক কোটি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। এতে করে উপকূলীয় অঞ্চলের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় ধরে মানুষকে মানবিক সংকটের মুখে থাকতে হয়।

দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্রের অভাব এবং আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছাতে ব্যর্থতা—এসব কারণেই প্রাণহানির সংখ্যা এত বেশি হয়েছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। অনেক মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিপদের গুরুত্ব বুঝতে পারেননি বা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারেননি।

ঘূর্ণিঝড়টি ৩০ এপ্রিল স্থলভাগে প্রবেশের পর ধীরে ধীরে শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়। তবে এর রেখে যাওয়া ক্ষয়ক্ষতি দীর্ঘ সময় ধরে দেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে। দেশের ১৯টি জেলার ১০২টি উপজেলা এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা জাতীয় পর্যায়ে একটি বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি করে।

এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার পরবর্তী সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপকভাবে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়, যাতে মানুষ দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারে। একই সঙ্গে আধুনিক আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু করা হয়, যা স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত তথ্য পৌঁছাতে সক্ষম।

এছাড়া স্বেচ্ছাসেবকভিত্তিক সতর্কতা কার্যক্রম, দুর্যোগ প্রস্তুতি প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে একটি কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা হয়। এসব উদ্যোগের ফলে পরবর্তী বছরগুলোতে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯১ সালের এই ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশকে দুর্যোগ মোকাবিলায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে বাধ্য করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আজও সেই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অব্যাহত উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

ভয়াল ২৯ এপ্রিল তাই শুধু একটি স্মৃতিচারণের দিন নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এই দিনে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

More News Of This Category

©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়

ওয়েবসাইট ডিজাইন : ইয়োলো হোস্ট
error: Content is protected !!