বাংলাদেশে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় গঠনের প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় এসেছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি হওয়া ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ বাতিল করায় আইনি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সরকার এই পদক্ষেপকে ‘স্বৈরাচারী মনোভাব দূরীকরণ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা কোন পথে এগোবে—তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ধারণাটি মূলত ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলা রায়ের মাধ্যমে ভিত্তি পায়। ওই রায়ে অধস্তন আদালতের বিচারকদের সিভিল সার্ভিস থেকে পৃথক একটি জুডিশিয়াল সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন এবং জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন করে।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করে। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগ প্রশাসনিকভাবেও নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হওয়ার সুযোগ পায়। ১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত ২৪ এপ্রিল যশোরে এক মতবিনিময় সভায় বলেন, “স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা থাকলেও সুপ্রিম কোর্ট তার স্বকীয়তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিগত সরকারের সময় তারা রাজনৈতিক কর্মীতে পরিণত হয়েছিল, তাই বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন জরুরি।”
অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্তকে অনেকেই বিচার বিভাগের জন্য নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা মোহাম্মদ শিশির মনির ৯ এপ্রিলকে বিচার বিভাগের ইতিহাসে ‘কালো দিন’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত একটি কাঠামো বিলুপ্ত করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।”
অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ—নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা এবং বিচার বিভাগ—পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। তার মতে, এ পদক্ষেপ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অন্তরায় হবে না এবং বর্তমানে বিচার বিভাগে সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রমাণও নেই।
অধ্যাদেশ বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে চলতি এপ্রিলে অ্যাডভোকেট সাদ্দাম হোসেন-সহ সাতজন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। ২০ এপ্রিল বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ বিষয়ে আপিল চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত রিটের শুনানি মুলতবি রাখেন।
তবে আদালত আশা প্রকাশ করেছেন যে, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সচিবালয়ের বিদ্যমান অবকাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনা হবে না।
এদিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন রাষ্ট্রপতির কাছে একটি আবেদন জানিয়েছেন। ২৬ এপ্রিল জমা দেওয়া ওই আবেদনে তিনি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে অভিযোগ তুলে বর্তমান সংসদ ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানান।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের ঘটনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে সরকার প্রশাসনিক ভারসাম্যের কথা বলছে, অন্যদিকে আইনজীবীদের একটি অংশ এটিকে বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ইস্যুতে আইনি লড়াই ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ই নির্ধারণ করবে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়