অবাধ তথ্যপ্রবাহের এই যুগে সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন, প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা নিশ্চিতকরণ এবং ভুয়া সাংবাদিকতা প্রতিরোধে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল সাংবাদিকদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ এবং একটি সমন্বিত অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
রোববার জাতীয় সংসদে বাগেরহাট-৪ আসনের বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে সংবাদ প্রচারের গতি যেমন বেড়েছে, তেমনি ভুয়া সংবাদ ও অপপ্রচারও বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকতার পেশাগত মান রক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, ভুয়া সংবাদ প্রতিরোধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার, ন্যারেটিভ নির্মাণ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতি মাসে ঢাকার বাইরে চারটি এবং ঢাকায় দুটি কর্মশালা আয়োজন করা হচ্ছে। এছাড়া ঢাকায় সাংবাদিক নেতাদের নিয়ে প্রতি মাসে অন্তত একটি বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা হবে।
তিনি আরও জানান, দেশের অভ্যন্তরে কর্মরত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও যোগাযোগ জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ভুয়া খবর শনাক্ত ও প্রতিরোধে ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা, মূলধারার গণমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনদের নিয়ে আলোচনা সভা ও সেমিনার আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
ভুয়া সংবাদ ও গুজব প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে তথ্য অধিদফতর থেকে ২২টি ফটোকার্ড এবং গুজব প্রতিরোধ বিষয়ক ১০টি তথ্যবিবরণী প্রস্তুত করে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের জন্য পাঠানো হয়েছে।
প্রেস কাউন্সিলের ভূমিকা সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনের আওতায় কোনো সংবাদপত্র বা সংবাদ সংস্থার সাংবাদিক কিংবা সম্পাদক কর্তৃক নীতি-নৈতিকতা ও জনরুচিবিরোধী সংবাদ প্রচার হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। বর্তমানে এ ধরনের আটটি অভিযোগ বিচারাধীন রয়েছে।
সাংবাদিকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন ও দায়িত্বশীলতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল ইতোমধ্যে ঢাকাসহ দেশের ৩২টি জেলায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের অংশগ্রহণে অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করেছে।
এছাড়া সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে প্রণীত প্রেস কাউন্সিল আইনকে যুগোপযোগী করে তুলতে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রতিষ্ঠানটি আরও শক্তিশালী, কার্যকর এবং গণমাধ্যমবান্ধব হয়ে উঠতে পারে।
সাংবাদিকদের কল্যাণে গৃহীত উদ্যোগগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যক্রমও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১১০ জন অসুস্থ, অসচ্ছল, দুর্ঘটনায় আহত সাংবাদিক এবং নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের মধ্যে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়া ৪০২ জন সাংবাদিক পরিবারের মেধাবী সন্তানদের জন্য ৭৩ লাখ ২৬ হাজার টাকার বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। ২০২৬ সালের রমজান মাসে ২ হাজার সাংবাদিক পরিবারের মধ্যে ১ কোটি ১২ লাখ ৩৪ হাজার টাকার ইফতার ও ঈদ উপহার বিতরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সব মিলিয়ে সরকার সাংবাদিকতার পেশাগত মানোন্নয়ন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে জানান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের গণমাধ্যম খাত আরও শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।