গুলিস্তান এলাকায় ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাটি অবৈধ ফুটপাত দখল, অস্থায়ী দোকান এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসার কারণে কার্যত চলাচলের অযোগ্য অবস্থায় পরিণত হয়েছিল। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই এলাকায় যাতায়াত করে, ফলে ফুটপাত দখল শুধু শৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং জনদুর্ভোগ ও নিরাপত্তারও একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসন ঘটা করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে এবং ঘোষণা দেয় যে ফুটপাতকে পথচারীদের জন্য মুক্ত করা হবে, যানজট কমানো হবে এবং শহরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে।
প্রাথমিকভাবে এই উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে রাস্তায় নেমে হাঁটতে বাধ্য হতো, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতো এবং যান চলাচলকে আরও জটিল করে তুলতো। গুলিস্তান, পল্টন ও আশপাশের এলাকায় এই সমস্যা আরও তীব্র ছিল। উচ্ছেদ অভিযানের পর কিছুদিনের জন্য পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিকও দেখা যায়। ফুটপাত খালি হয়, মানুষ স্বস্তিতে হাঁটতে পারে এবং যান চলাচলেও কিছুটা গতি আসে।
কিন্তু এই স্বস্তি খুব বেশি স্থায়ী হয়নি। কিছুদিন পর থেকেই আবারও একই চিত্র ধীরে ধীরে ফিরে আসতে শুরু করে। আগের মতোই অস্থায়ী দোকান বসতে থাকে, কিছু নতুন দোকানও যুক্ত হয়। ফুটপাত আবারও দখল হয়ে যায় এবং পথচারীদের জন্য সেই পুরনো দুর্ভোগ ফিরে আসে। এই পুনরাবৃত্তি অনেককে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে যে আসলে এই উচ্ছেদ অভিযানের উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং এটি কি সত্যিই স্থায়ী কোনো পরিবর্তনের অংশ ছিল, নাকি কেবল সাময়িক একটি ব্যবস্থা।
বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফুটপাত দখল পুনরায় ফিরে আসার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, উচ্ছেদ করা ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো স্থায়ী বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয়েই আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এই ফুটপাতকেই তাদের একমাত্র জীবিকা হিসেবে ব্যবহার করে। তাদের জন্য আলাদা ভেন্ডিং জোন বা পুনর্বাসন ব্যবস্থা না থাকলে শুধুমাত্র উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, নিয়মিত নজরদারির ঘাটতি একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। উচ্ছেদ অভিযান সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সময়ে জোরালোভাবে পরিচালিত হয়, কিন্তু এরপর ধারাবাহিকভাবে তদারকি না থাকলে দখল দ্রুত ফিরে আসে। কিছুদিন পর প্রশাসনিক উপস্থিতি কমে গেলে পুরনো চক্র আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। এতে করে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে দখলদারিত্ব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনার পর সমন্বিত ফলোআপ না থাকায় পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
চতুর্থত, অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই সমস্যার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অনেক নিম্নআয়ের মানুষ জীবিকার জন্য বিকল্প কোনো সুযোগ না পেয়ে ফুটপাত ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। শহরে পর্যাপ্ত সাশ্রয়ী বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকলে এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি স্বাভাবিকভাবেই টিকে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে জনমনে একটি দ্বিধা তৈরি হয়েছে। একদিকে মানুষ চায় ফুটপাত মুক্ত হোক, শহর সুন্দর ও চলাচলযোগ্য হোক। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকার প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। ফলে সমস্যাটি কেবল আইন-শৃঙ্খলার নয়, বরং একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র উচ্ছেদ অভিযান কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বরং একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন, যেখানে পথচারীদের অধিকার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা—দুটিকেই বিবেচনায় নেওয়া হবে। নির্দিষ্ট জায়গায় লাইসেন্সভিত্তিক ভেন্ডিং জোন তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া শহর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবও স্পষ্ট। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে হঠাৎ অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এখানে ধারাবাহিক নীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। না হলে একই সমস্যা বারবার ফিরে আসবে, যা জনদুর্ভোগ আরও বাড়াবে।
গুলিস্তানের বর্তমান চিত্র তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। উচ্ছেদ অভিযান যতটা না সমাধান, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো পরবর্তী পর্যায়ে সেই পরিবর্তন ধরে রাখা। যদি ধারাবাহিক তদারকি, পুনর্বাসন এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা না থাকে, তবে যে কোনো পরিবর্তনই সাময়িক হয়ে পড়বে।
সবশেষে বলা যায়, গুলিস্তান ফুটপাতের পরিস্থিতি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সম্ভাবনা দুটোই তুলে ধরে। এটি দেখায় যে কেবল কঠোর অভিযান দিয়ে নয়, বরং মানবিক, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই একটি টেকসই সমাধান সম্ভব। শহরকে সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য করতে হলে দখল-উচ্ছেদের চক্র থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্থায়ী ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়