
নফল নামাজের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো তাহাজ্জুদের নামাজ। সাধারণত রাতের শেষভাগে, বিশেষ করে শেষ তৃতীয়াংশে এ নামাজ আদায় করা হয়। এ সময়টি দোয়া ও ইবাদতের জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে বলতে থাকেন, কে আছে এমন—যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছে এমন—যে আমার কাছে চাইবে? আমি তাকে তা দেব। কে আছে এমন—যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।’
—বোখারি : ১১৪৫
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাহাজ্জুদের ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন এবং নিয়মিত এ নামাজ আদায় করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘হে আবদুল্লাহ, কিয়ামুল লাইল (তাহাজ্জুদের নামাজ) কখনো ছেড়ো না। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) তা কখনো ছাড়েননি। কখনো অসুস্থতা বা দুর্বলতা বোধ করলে বসে আদায় করতেন।’
—আবু দাউদ : ১৩০৯
অনেকেই তাহাজ্জুদ আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু ঘুমের কারণে অনেক সময় শেষ রাতে জাগতে পারেন না। হাদিসে এমন কিছু আমলের কথা এসেছে, যেগুলোর মাধ্যমে রাতভর ইবাদতের সমপরিমাণ সওয়াব লাভের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমন সাতটি আমল হলো—
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে এশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করল, সে যেন পূর্ণ রাত নফল নামাজ আদায় করল।’
—আবু দাউদ : ৫৫৫
অর্থাৎ, এশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা রাতভর নফল নামাজ আদায়ের ফজিলত লাভের একটি মাধ্যম।
রাতে পবিত্র কোরআনের অন্তত ১০০ আয়াত তেলাওয়াতের ব্যাপারেও বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে রাতে ১০০ আয়াত তেলাওয়াত করবে, তার জন্য পুরো রাত ইবাদতে কাটানোর সওয়াব লেখা হবে।’
—মুসনাদে আহমাদ : ১৬৯৫৮
তাই ঘুমানোর আগে কোরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
তাহাজ্জুদ আদায়ের দৃঢ় নিয়ত করে ঘুমানোও গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি নিয়ত করে ঘুমাতে যান, কিন্তু প্রবল ঘুমের কারণে জাগতে না পারেন এবং ভোর হয়ে যায়, তাহলে তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাওয়ার কথা হাদিসে এসেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করার নিয়ত করে ঘুমাতে যায়, এরপর চোখে প্রবল ঘুম থাকার কারণে জাগতে জাগতে ভোর হয়ে যায়, তার জন্য তার নিয়ত অনুসারে সওয়াব লেখা হবে এবং আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে তার ঘুম তার জন্য সদকাস্বরূপ হবে।’
—নাসায়ি : ১৭৮৭
রমজান মাসে ইমামের সঙ্গে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারাবির নামাজ আদায় করারও বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
আবু জর গিফারি (রা.)-এর এক প্রশ্নের উত্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইমামের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত নামাজ আদায় করে, তাহলে তাকে পুরো রাত নামাজ আদায়কারী হিসেবে গণ্য করা হবে।’
—আবু দাউদ : ১৩৭৫
উল্লিখিত হাদিসে ‘নামাজ’ বলতে রমজানের তারাবির নামাজকে বোঝানো হয়েছে বলে অধিকাংশ ইসলামি স্কলারের অভিমত রয়েছে।
—মিরকাতুল মাফাহিত, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৩১৮
অসহায় বিধবা ও মিসকিনদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করাও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বিধবা ও মিসকিনদের অভাব দূর করার জন্য সচেষ্ট ব্যক্তি আল্লাহর পথে মুজাহিদের মতো অথবা ওই ব্যক্তির মতো (সওয়াব পাবে), যিনি রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করেন এবং দিনে রোজা রাখেন।’
—বোখারি : ৫৩৫৩
জুমার দিন যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে দ্রুত মসজিদে যাওয়া, ইমামের কাছাকাছি বসা এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনারও বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে জুমার দিন (ফরজ গোসলের মতো) ভালোভাবে গোসল করবে, সকাল সকাল ঘর থেকে বের হবে, কোনো বাহনে না চড়ে হেঁটে মসজিদে যাবে, ইমামের কাছাকাছি বসবে এবং কোনো ধরনের অনর্থক কথা না বলে মনোযোগ সহকারে খুতবা শুনবে; সে মসজিদে যাওয়ার প্রতি কদমের বিনিময়ে এক বছর রোজা রাখা এবং রাতভর তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।’
—আবু দাউদ : ৩৪৫
আল্লাহর পথে দ্বীনের জন্য পাহারাদারি বা রিবাতেরও রয়েছে বিশেষ মর্যাদা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এক দিন ও এক রাত আল্লাহর রাস্তায় সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস ধরে রোজা রাখা এবং রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করার চেয়েও শ্রেষ্ঠ।’
—মুসলিম : ১৯১৩
তাহাজ্জুদ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ নফল ইবাদত। তাই সম্ভব হলে প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিয়মিত তাহাজ্জুদ আদায়ের চেষ্টা করা। তবে কোনো কারণে শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠতে না পারলে হতাশ না হয়ে হাদিসে বর্ণিত অন্যান্য ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো করার চেষ্টা করা উচিত।
আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগি করার এবং তাহাজ্জুদের মতো গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত নিয়মিত আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।