টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কালনী-কুশিয়ারা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় তলিয়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ বোরো ফসলি জমি। ফসল রক্ষার শেষ আশ্রয় ‘ধানের খলা’ও পানিতে ডুবে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে আজমিরীগঞ্জে ১৪ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ১০৭ হেক্টর জমির ধান ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০৭ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। একদিনেই কালনী-কুশিয়ারা নদীর পানি প্রায় ২ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাওরের নিচু এলাকাগুলো দ্রুত প্লাবিত হওয়ায় কৃষকরা পাকা ধান কাটার সুযোগ পাচ্ছেন না। অনেকেই কেটে রাখা ধান খলায় জড়ো করেছিলেন, কিন্তু আকস্মিক ঢলে সেই ধানও পানিতে তলিয়ে গেছে। ত্রিপল দিয়ে ধান রক্ষার চেষ্টা করেও পানির তীব্র স্রোতের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
বদলপুর ইউনিয়নের কৃষক রাখেশ দাস জানান, তার ৩২ কিয়ার পাকা ধান চোখের সামনেই পানিতে ডুবে গেছে। একইভাবে কেরারবন, ধরের বাঁধ ও মাইঝবনসহ বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
কাকাইলছেও ইউনিয়নেও একই চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল খায়ের মাহদী জানান, এলাকার বড় বড় হাওর ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। কৃষক আদর আলী মিয়া ৭৫ কিয়ারের মধ্যে মাত্র ৮ কিয়ার এবং কাবিল মিয়া ৮০ কিয়ারের মধ্যে অল্প কিছু ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন। প্রান্তিক কৃষক আবু ছালেক মিয়ার ৪ কিয়ার জমির সম্পূর্ণ ফসলই এই অকাল বন্যায় নষ্ট হয়ে গেছে।
বন্যার পাশাপাশি তীব্র শ্রমিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। টানা বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে ধান কাটার শ্রমিকরা মাঠে নামতে অনীহা প্রকাশ করছেন। ফলে অনেক ক্ষেতেই পাকা ধান সময়মতো ঘরে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। কিছু এলাকায় কাটা ধান পানির স্রোতে ভেসে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত কালনী-কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন বলেন, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০৭ হেক্টর জমি নিমজ্জিত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এদিকে, নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনজীবন। পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কায় চরম উদ্বেগে রয়েছেন আজমিরীগঞ্জের হাওরবাসী।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়