
প্রথমবারের মতো কক্ষপথে পৌঁছেছে স্পেসএক্সের বিশালাকৃতির স্টারশিপ রকেট। সোমবার টেক্সাসের স্টারবেস উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে পরিচালিত ১৪তম পরীক্ষামূলক ফ্লাইটে মহাকাশযানটি কক্ষপথে ২৬টি নতুন প্রজন্মের স্টারলিংক ভি৩ স্যাটেলাইটও স্থাপন করেছে। তবে একটি ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় সাত ঘণ্টা আগেই মিশনটি শেষ করতে হয়।
স্টারশিপের এ পরীক্ষামূলক ফ্লাইটটি প্রায় ১০ ঘণ্টা চলার কথা ছিল। উৎক্ষেপণের পর মহাকাশযানটি নিচের অংশের সুপার হেভি বুস্টার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর এর তিনটি প্রধান ইঞ্জিনের একটি নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যায়। শুরুতে স্পেসএক্স জানায়, ইঞ্জিনের সমস্যার কারণে স্টারশিপকে কক্ষপথে পাঠানোর পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হতে পারে।
পরে প্রকৌশলীরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখতে পান, অন্য ইঞ্জিন ব্যবহার করেও কক্ষপথে পৌঁছানো সম্ভব। এরপর পরিকল্পনা পরিবর্তন করে স্টারশিপকে কক্ষপথে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সফলভাবেই মহাকাশযানটি কক্ষপথে পৌঁছে যায়।
কক্ষপথে প্রায় ২৬৯ কিলোমিটার উচ্চতায় পৌঁছানোর পর একে একে ২৬টি স্টারলিংক ভি৩ স্যাটেলাইট স্থাপন করে স্টারশিপ। এটিই স্টারশিপের ইতিহাসে প্রথম কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপনের ঘটনা। স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, সবগুলো স্যাটেলাইটই নির্ধারিত কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে।
অ্যারোস্পেস প্রকৌশলী ডিন স্ল্যাডেন বলেন, সবগুলো স্যাটেলাইটকে নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছে দেওয়া বড় একটি সাফল্য। বিশেষ করে এটি স্টারশিপের প্রথম বাণিজ্যিক আয়ের মিশন হওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বেশি। তবে প্রকৌশলগত দিক থেকে ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিয়ে মিশন চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
স্টারশিপের আগের কয়েকটি পরীক্ষামূলক ফ্লাইটেও ইঞ্জিন-সংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। মহাকাশে মহাকাশযানের গতিপথ নিয়ন্ত্রণে ইঞ্জিনের নির্ভরযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে নাসার নভোচারীদের চাঁদে পাঠানোর মিশনে এর গুরুত্ব আরও বাড়বে। স্টারশিপের কক্ষপথে পৌঁছানোর সফলতায় নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যানও স্পেসএক্সকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
মিশনের শেষ পর্যায়ে স্টারশিপের নিয়ন্ত্রিত অবতরণ প্রশান্ত মহাসাগরে সম্পন্ন হয়। সাগরের ওপর নামার সময় থ্রাস্টার ব্যবহার করে মহাকাশযানটিকে উল্লম্ব অবস্থায় ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। পরে নাক ওপরের দিকে থাকা অবস্থায় এটি পানিতে অবতরণ করে। পানিতে নামার পর রকেটটির নিচের অংশে আগুন ধরে যায় এবং একপর্যায়ে মহাকাশযানটি কাত হয়ে পড়ে। এতে বড় ধরনের আগুনের গোলা দেখা যায়। মিশনের পর এটি সমুদ্র থেকে উদ্ধার করে পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল না।
স্টারশিপের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে দ্রুত স্টারলিংক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ এবং নাসার চাঁদে মানুষ পাঠানোর মিশনে ব্যবহার করা। নতুন কোনো রকেটের জন্য কক্ষপথে পৌঁছানো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষামূলক ধাপ। ২০২৩ সাল থেকে স্টারশিপের আগের ১৩টি পরীক্ষামূলক ফ্লাইটই কক্ষপথের নিচে সীমাবদ্ধ ছিল।
প্রায় এক দশকের উন্নয়ন কর্মসূচিতে স্টারশিপ প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে স্পেসএক্স। ইলন মাস্কের লক্ষ্য ভবিষ্যতে বছরে শত শত কিংবা হাজারো স্টারশিপ মিশন পরিচালনা করা। তিনি সম্প্রতি দাবি করেছেন, প্রতি ঘণ্টায় একটি করে স্টারশিপ উৎক্ষেপণের সক্ষমতা অর্জন করতে আরও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।
স্পেসএক্স জানিয়েছে, সোমবার উৎক্ষেপণ করা স্টারলিংক ভি৩ স্যাটেলাইটগুলো আগের ভি২ মিনি স্যাটেলাইটের তুলনায় ১০ গুণ বেশি ডেটা পরিচালনা করতে সক্ষম। স্টারশিপ নিয়মিত কার্যক্রমে গেলে প্রতি উৎক্ষেপণে ৬০টি করে ভি৩ স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির।