মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। অঞ্চলটির কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় আরও একটি পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন। নতুন এই রণতরীর নাম USS George H. W. Bush।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এতে বলা হয়, রণতরীটি ইতোমধ্যে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থান করছে এবং প্রয়োজনে দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা যাবে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্য থেকে যাত্রা শুরু করে এই রণতরী। আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে আফ্রিকার উপকূল ঘুরে বর্তমানে এটি ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্পর্শকাতর এলাকায় দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব।
USS George H. W. Bush যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অন্যতম আধুনিক এবং শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী। এটি নিমিটজ-শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত এবং সম্পূর্ণরূপে পরমাণু শক্তিচালিত। যুক্তরাষ্ট্রের মোট ১০টি সক্রিয় বিমানবাহী রণতরীর মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। এই ধরনের রণতরীগুলোতে একসঙ্গে বহু যুদ্ধবিমান বহন এবং পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে, যা সামরিক অভিযানে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট শুরু হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও Israel-এর যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে সংঘাতের সূচনা হয়। এর আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে প্রথমে USS Abraham Lincoln মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র।
এরপর মার্চের মাঝামাঝি সময়ে আরও একটি অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরী USS Gerald R. Ford ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়। তবে এই রণতরীটি বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করতে পারেনি। যান্ত্রিক ত্রুটি, অগ্নিকাণ্ড এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জটিলতার কারণে মার্চের শেষ সপ্তাহে এটিকে মেরামতের জন্য প্রত্যাহার করা হয়।
জানা গেছে, USS Gerald R. Ford লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল অতিক্রম করে ইউরোপের ক্রোয়েশিয়ার একটি বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। একই সময় ভার্জিনিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে USS George H. W. Bush, যা এখন কার্যত সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে।
এদিকে, টানা প্রায় ৪০ দিন সংঘাত চলার পর গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও Iran যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। প্রাথমিকভাবে দুই সপ্তাহের জন্য এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হলেও পরবর্তীতে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোলা রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন রণতরী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরানসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির স্বার্থ জড়িয়ে আছে। ফলে সামান্য উত্তেজনাও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতি একদিকে যেমন প্রতিরোধমূলক কৌশল হিসেবে কাজ করতে পারে, অন্যদিকে তা নতুন করে উত্তেজনা বাড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতির সময়ে এই ধরনের পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে আপাতত যুদ্ধবিরতি বজায় থাকলেও পর্দার আড়ালে সামরিক প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই রণতরী মোতায়েন সেই প্রস্তুতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়