
নিজের পকেট থেকে চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে ২০২২ সালে বাংলাদেশে ১ কোটি ৮ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ এ পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের (এইচইইউ) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও সুইডিশ দূতাবাসের সহায়তায় পরিচালিত ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা বণ্টন’ শীর্ষক গবেষণার ফল গত বুধবার উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৫ সালে চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে ৫৬ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিলেন, যা সে সময়ের জনসংখ্যার ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে, দেশে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ২০০৫ সালের ৪০ শতাংশ থেকে কমে ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়ালেও চিকিৎসাব্যয়ের কারণে আর্থিক সংকটে পড়া মানুষের অনুপাত বেড়েছে।
২০০৫ সালে চিকিৎসার খরচ বহন করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন ২৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ। ২০২২ সালে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৭ শতাংশে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী এ হার ছিল ২৬ শতাংশ।
গবেষণার ফোকাল পয়েন্ট সুব্রত পাল বলেন, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুগেছে দরিদ্র পরিবারগুলো। মূল্যস্ফীতির প্রভাব সমন্বয় করার পরও পরিবারের নিজস্ব চিকিৎসাব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৫ সালে একটি পরিবারের মাসিক গড় চিকিৎসাব্যয় ছিল ১ হাজার ২৪১ টাকা। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৩৮ টাকায়। একই সময়ে চিকিৎসার জন্য নিজস্ব অর্থ ব্যয় করেছে—এমন পরিবারের অনুপাত ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
গবেষণায় ২০০৫, ২০১০, ২০১৬ ও ২০২২ সালে পরিচালিত খানা আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। চিকিৎসার ব্যয়ের প্রবণতা, দারিদ্র্যের ওপর এর প্রভাব এবং সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য মূল্যায়ন ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
চিকিৎসার জন্য ওষুধ কেনা, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং অন্যান্য চিকিৎসাসেবা নিতে পরিবারকে সরাসরি যে অর্থ ব্যয় করতে হয়, তাকে নিজস্ব চিকিৎসাব্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানোর পর অবশিষ্ট অর্থের ৪০ শতাংশের বেশি চিকিৎসায় ব্যয় হলে তা আর্থিক সংকটের সূচক হিসেবে ধরা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসাব্যয়ের কারণে পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের হার ২০০৫ সালের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৩২ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সুব্রত পাল বলেন, এ চিত্র থেকে বোঝা যায়, আর্থিক চাপে না পড়ে চিকিৎসার খরচ বহন করার ক্ষেত্রে পরিবারগুলোর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
২০২২ সালে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষের মধ্যে ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। বিপরীতে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
গ্রাম ও শহর—উভয় এলাকাতেই চিকিৎসাব্যয়ের কারণে আর্থিক সংকট বেড়েছে। তবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ সংকট ছিল বেশি। ২০২২ সালে গ্রামের ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ এ পরিস্থিতির শিকার হন। শহরাঞ্চলে এ হার ছিল ২৮ দশমিক ২ শতাংশ।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৫ সালে আর্থিক সংকটে পড়া মানুষের হার সবচেয়ে কম ছিল বরিশাল বিভাগে, ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২ সালে বিভাগটিতেই এ হার বেড়ে সর্বোচ্চ ৫৯ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছায়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, চিকিৎসার খরচের বড় অংশ ব্যয় হয় ওষুধ, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ফি বাবদ। বহির্বিভাগের চিকিৎসা নিতে ফার্মেসির ওপর নির্ভরশীলতাও বেড়েছে। ২০১৬ সালে এ ধরনের চিকিৎসাসেবার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ ফার্মেসির মাধ্যমে নেওয়া হতো। ২০২২ সালে এ হার বেড়ে ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়ায়।
পরিবারের মোট ভোগব্যয়ের ১০ শতাংশের বেশি চিকিৎসায় ব্যয় হলে তাকে বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয় বলা হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত বছর এ সূচকের পরিবর্তে চিকিৎসাব্যয়ের কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকটকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। কারণ, শুধু বিপর্যয়কর স্বাস্থ্যব্যয়ের সূচক দিয়ে মানুষের প্রকৃত আর্থিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যায় না।
গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর অনুপাত কমেছে। ২০১৬ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। ২০২২ সালে এ হার কমে ৫৬ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়ার হার একই সময়ে ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা বণ্টন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে গবেষণাটি। এতে বলা হয়েছে, দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন বেশি হলেও সরকারি স্বাস্থ্যব্যয়ের সুবিধা যথাযথভাবে তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০২২ সালে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে দরিদ্রদের অনুকূলে থাকা সুবিধা বণ্টনের প্রবণতা কমেছে।
চিকিৎসাব্যয়ের কারণে মানুষের আর্থিক সংকট কমাতে সরকারি অর্থায়ন বাড়ানো, ব্যয়ের দক্ষতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র মানুষের কাছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার সুপারিশ করেছে গবেষণা দল। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধ ও রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা বিনামূল্যে ও নির্ভরযোগ্যভাবে সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের জন্য নিয়মিত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের স্বাস্থ্য খাতের যে শোচনীয় অবস্থা তৈরি হয়েছিল, গবেষণার ফল তা তুলে ধরেছে। চিকিৎসার নিজস্ব ব্যয় আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে সরকার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অনুষ্ঠানে গবেষণার ফল উপস্থাপনায় আরও ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের তোহিদুল ইসলাম ও সায়েম আহমেদ। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাজেশ নারওয়াল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক এনামুল হক।