
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের চেয়ে মতপার্থক্যই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক কৃতিত্ব, এর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর অবস্থানগত পার্থক্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধ এখন শুধু ‘কে বেশি ভূমিকা রেখেছে’—এ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। বরং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পারস্পরিক অবস্থান এবং রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন কী হবে, তা নিয়েও দুই ধারার রাজনীতির মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে।
বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতার অংশ। তাদের দাবি, এটি বৈষম্য দূরীকরণ, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন।
দলটির নেতারা বলছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি, আর ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্বাধীন রাষ্ট্রে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই একটি ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যটিকে খাটো করা উচিত নয়।
বিএনপির মতে, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব কমানোর চেষ্টা করলে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছে। দল দুটি সংবিধানের আমূল সংস্কার এবং গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে।
এ কারণেই সরকারের গঠিত সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে প্রতিনিধি পাঠায়নি জামায়াত, এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস।
জামায়াতের সংসদীয় দলের মুখপাত্র নাজিবুর রহমান বলেন, তারা সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধানের মৌলিক সংস্কার চান।
রাজধানীতে এক সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে সংবিধান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সরকার ক্ষমতায় এসে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করেনি।
তিনি অভিযোগ করেন, জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান না দেখিয়ে সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন থেকে সরে এসেছে।
জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বের কৃতিত্ব তরুণদের উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি বা দল এককভাবে এই আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করতে পারে না। ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা হলে জনগণ তা প্রতিহত করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকার সংবিধান ‘সংস্কার’ নয়, ‘সংশোধন’ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত একটি মৌলিক দলিল। এটি নতুন করে লেখার সুযোগ নেই; তবে সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংশোধন করা যেতে পারে।
তিনি জানান, জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা পর্যালোচনা করবে বিশেষ সংসদীয় কমিটি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা দলের একক অর্জন নয়; এটি দীর্ঘদিনের আন্দোলন, আত্মত্যাগ ও নির্যাতনের ধারাবাহিক ফল।
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জুলাইয়ের অর্জনকে দলীয়করণ না করে গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সংস্কার পরিষদ কিংবা অন্য যে নামই দেওয়া হোক না কেন, বাস্তবে সংস্কার কার্যকর করতে হলে সংসদের মাধ্যমেই সংবিধান সংশোধন করতে হবে। প্রতিটি সংশোধনীই একেকটি সংস্কার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো ও জাতীয় ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে। একদিকে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ঘোষণা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একই ধারাবাহিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোট জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছে।