
টানা ভারী বর্ষণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা বেড়েছে। কক্সবাজারে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতায় জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ১২ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
মঙ্গলবার প্রকাশিত পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তাসহ দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। তবে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণাধীন কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। ১২৭টি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে ৩৮টিতে পানি বেড়েছে, ৮৬টিতে কমেছে এবং তিনটিতে অপরিবর্তিত রয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে অতি ভারী এবং সিলেট ও বরিশাল বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সময়ে ভারতের মেঘালয় ও ত্রিপুরাতেও ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের উজানের নদীগুলোর পানির প্রবাহে পড়তে পারে। এদিকে ভারতের উড়িষ্যা ও দক্ষিণ ঝাড়খণ্ড এলাকায় অবস্থানরত মৌসুমি নিম্নচাপটি দুর্বল হয়ে বর্তমানে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে গোমতী, মুহুরি, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী ও খাগড়াছড়ির নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিচু এলাকাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কিছু এলাকায় নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। অন্যদিকে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে নীলফামারী ও লালমনিরহাটের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সময়ে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বেড়ে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের কিছু নিচু এলাকা প্লাবিত হতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ ২৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে চট্টগ্রামে। এছাড়া নারায়ণহাটে ১৬৫ মিলিমিটার, টেকনাফে ১৫৮ মিলিমিটার, কক্সবাজারে ১২৯ মিলিমিটার, রামগড়ে ১০৫ মিলিমিটার এবং বান্দরবানে ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারতের মেঘালয়ের মাওকিরওয়াতে ১৫৩ মিলিমিটার এবং চেরাপুঞ্জিতে ১৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা উজানের নদীগুলোর পানি আরও বাড়াতে পারে।
এদিকে টানা বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি এবং দীঘিনালা-লংগদু সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার পরিবার, অর্থাৎ প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার মানুষ পাহাড়ধসের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রামেও টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের প্রভাবে মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা ও আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস ৩৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত বহাল রেখেছে এবং আগামী ৭২ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে।
জলাবদ্ধতার কারণে নগরীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক এলাকায় গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় মানুষকে হাঁটুপানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া কয়েকটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প এখনো পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হয়নি। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন দাবি করেছেন, নালা পরিষ্কার এবং চলমান উন্নয়নকাজের কারণে আগের তুলনায় নগরীর সামগ্রিক জলাবদ্ধতা প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। এদিকে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।