রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামি সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। আলোচিত এ ঘটনায় শিশু নিরাপত্তা, মাদকাসক্তি এবং পারিবারিক পরিবেশে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সোহেল রানা। আদালত সূত্রে জানা গেছে, জবানবন্দিতে তিনি ঘটনার আগে মাদক সেবনের কথাও উল্লেখ করেছেন।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত সোহেল রানা পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেও ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন। এ ঘটনায় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, ঘটনার সময় তিনি কী ভূমিকা পালন করেছেন এবং পরিকল্পিতভাবে শিশুটিকে ঘরে নেওয়ার পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল কি না।
পুলিশ ও মামলার সূত্রে জানা যায়, নিহত রামিসা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে সে বাসা থেকে বের হওয়ার পর প্রতিবেশী ফ্ল্যাটে যায়। কিছু সময় পর শিশুটিকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা আশপাশে অনুসন্ধান শুরু করেন। একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের সামনে তার জুতা দেখতে পেয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার পর আসামি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তদন্তকারীরা জানান, প্রযুক্তিগত নজরদারি ও বিভিন্ন সূত্রের ভিত্তিতে তার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় শিশু হত্যা, ধর্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পুলিশ বলছে, মামলাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে এবং দ্রুত চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
ঘটনার পর পল্লবী এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলছেন, পরিচিত পরিবেশ ও প্রতিবেশীর বাসাতেও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, অভিযুক্ত সোহেল রানা এলাকায় খুব বেশি মেলামেশা করতেন না। তবে তার চলাফেরা নিয়ে মাঝে মাঝে সন্দেহের কথা শোনা যেত। ঘটনার পর তারা বিস্ময় ও আতঙ্ক প্রকাশ করেন। শিশুদের অবাধ চলাফেরা এবং ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা এবং পারিবারিক নজরদারির সঙ্গেও জড়িত। তাদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকাসক্তি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
মনোবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শিশুদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আচরণগত সমস্যার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। তারা বলছেন, মাদকাসক্তি অনেক সময় ব্যক্তির আচরণকে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই এমন অপরাধের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
আইনজীবীদের মতে, শিশু নির্যাতন ও হত্যা মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তারা বলছেন, এ ধরনের অপরাধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর হলে সমাজে ইতিবাচক বার্তা যাবে এবং ভবিষ্যতে অপরাধপ্রবণতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
এদিকে ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই শিশুটির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে অপরাধীদের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন। একই সঙ্গে রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিকরা।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন, আলামত বিশ্লেষণ এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। তদন্ত শেষ হলে আদালতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
শিশু রামিসার মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। স্বজনরা বলছেন, তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চান। এলাকাবাসীও দ্রুত বিচার এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়