রাজধানীর পল্লবী এলাকায় আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাঈদের আদালতে হাজির করে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় তিনি ১৬৪ ধারায় শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নৃশংস এই অপরাধের সময় সোহেল রানার সঙ্গীতে আরও একজন সহযোগী ছিলেন। ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার নিজ বাসার একটি কক্ষে ঘুমিয়ে ছিলেন। সেই সুযোগে সোহেল ওই কক্ষের বাইরে থেকে সিটকিনি লাগিয়ে দেন এবং ফ্ল্যাটের বাইরে থেকে রামিসাকে জোরপূর্বক ভেতরে নিয়ে আসেন। এ সময় তার অজ্ঞাতনামা সহযোগীটিও উপস্থিত ছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, রামিসা চিৎকার করলে অভিযুক্তরা তার মুখ ওড়না দিয়ে বেঁধে ফেলে এবং বাথরুমে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে শ্বাসরোধ ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ খণ্ড-বিখণ্ড করে গুম করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঠিক সেই সময় রামিসার স্বজন ও প্রতিবেশীরা নিখোঁজ শিশুর সন্ধানে এসে বাইরে থেকে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার আগ মুহূর্তে সোহেল ও তার সহযোগী জানালার লোহার গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। স্থানীয়রা ঘরের ভেতর থেকে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন। স্বপ্না আক্তারকে বুধবার ঢাকার আরেক মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হকের আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে তাকেও কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। সোহেল ও স্বপ্নাকে দুটি পৃথক আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া রিপন আবেদন করেন।
তবে সোহেলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড হওয়ায় তাকে নতুন করে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, বাইরের হৈ-চৈয়ে স্বপ্নার ঘুম ভাঙলে তিনি দেখেন কক্ষের বাইরের সিটকিনি খোলা। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে রামিসার রক্তাক্ত লাশ দেখতে পান। স্থানীয়রা দরজায় আঘাত করলেও স্বপ্না ভেতর থেকে দরজা না খুলে স্বামী ও তার সঙ্গীকে পালাতে সহায়তা করেছিলেন বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
পুলিশ কর্মকর্তা অহিদুজ্জামান আরও জানান, রামিসাকে হত্যার পর তার দেহ টুকরো টুকরো করে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ফ্ল্যাটের একটি কক্ষে শিশুটির মস্তকবিহীন দেহ পড়ে ছিল এবং আরেক কক্ষের প্লাস্টিকের বালতিতে তার খণ্ডিত মাথা লুকানো ছিল। ধারালো অস্ত্র দিয়ে শিশুটির মাথা শরীর থেকে আলাদা করা হয় এবং তার যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয়। এ ছাড়া দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ খাটের নিচে লুকানো হয়েছিল।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করলে অভিযুক্তদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখেন। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত রামিসা রাজধানীর একটি স্থানীয় স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
এই ঘটনায় শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন, যেখানে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারসহ মোট তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। পলাতক ওই সহযোগীর নাম এখনই প্রকাশ করতে রাজি হয়নি পুলিশ। তবে তাকে দ্রুত গ্রেফতারের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তাকে ‘অজ্ঞাতনামা’ হিসেবে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরো ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়