জনগণের দেওয়া গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করলে দেশ নতুন করে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অনাস্থার সংকটে পড়তে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি বলেন, বিশ্বের ইতিহাসে এমন কোনো নজির নেই যেখানে সরকার জনগণের দেওয়া গণভোটের রায় অমান্য করেছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) রাজধানীর Institution of Diploma Engineers Bangladesh (আইইডিবি) মিলনায়তনে ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার : সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারের আয়োজন করে ১১ দলীয় ঐক্য।
কিনোট উপস্থাপনায় শিশির মনির বলেন, “গণঅভ্যুত্থান কখনোই সংবিধান মেনে হয় না, বরং তা সংবিধানের বাইরে থেকেই সৃষ্টি হয়।” তার মতে, বর্তমানে একটি রাজনৈতিক বিষয়কে আদালতের বিচারাধীন বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী ১৯ তারিখ আদালত খোলার পর সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশের প্রশ্নটি উত্থাপিত হবে। আদালতের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, “যদি বাংলাদেশের আদালত তার মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে, তাহলে এই ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া উচিত।”
সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, গণভোটের ফলাফল মেনে ১৮০ দিনের জন্য একটি সংবিধান সংস্কার সভার অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। এরপর পার্লামেন্টকে দুই কক্ষে—উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষে—বিভক্ত করার প্রস্তাব দেন তিনি। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যেখানে ভোটের সংখ্যানুপাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আসন পাবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন না করা হলে তা ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।”
আন্তর্জাতিক উদাহরণ তুলে ধরে শিশির মনির জানান, তিনি সুইজারল্যান্ড থেকে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত মোট ২৬টি দেশের নজির পর্যালোচনা করেছেন। তার দাবি, বিশ্বের কোথাও এমন উদাহরণ নেই যেখানে জনগণ গণভোটের মাধ্যমে রায় দেওয়ার পর সরকার তা উপেক্ষা করেছে।
রাজনৈতিক বিষয় আদালতে টেনে আনার সমালোচনা করে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রাজনৈতিকভাবে প্রবর্তিত হয়েছিল, কিন্তু সেটিকে আদালতের মাধ্যমে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করা হয়। এর ফলে দেশে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পরে আবার একই বিষয়কে সাংবিধানিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে—এমন উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান আদালতে খোঁজা হলে সংকট আরও বাড়ে।
সরকারের উদ্দেশ্যে কড়া ভাষায় তিনি বলেন, “মিসাইল ছুড়লে তার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে হয়। তা না হলে সেই মিসাইল কোথায় গিয়ে পড়বে, তা বলা যায় না।” তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, সরকারের বর্তমান পদক্ষেপ ভবিষ্যতে তাদের জন্যই বিপদ ডেকে আনতে পারে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডা. শফিকুর রহমান, যিনি বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির। বিশেষ অতিথি ছিলেন নাহিদ ইসলাম, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা মামুনুল হক, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির।
সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণভোটের গুরুত্ব এবং সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতামত তুলে ধরেন। বক্তারা মনে করেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে জনগণের মতামত ও গণভোটের রায় যথাযথভাবে সম্মান করা জরুরি।
সামগ্রিকভাবে, এই সেমিনার দেশের চলমান রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গণভোট, সংবিধান সংস্কার এবং বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু অনুমতি ছাড়া ব্যবহারযোগ্য নহে