
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনায় ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট’ পদ সৃষ্টির প্রস্তাব এসেছে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সংবিধান সংশোধন কমিটির নবম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, উচ্চকক্ষ গঠিত হলে এবং সেটি নিম্নকক্ষের সঙ্গে একই সময়ে বিলুপ্ত না হলে, উচ্চকক্ষের কাঠামোর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া রাখা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টি করে তাঁকে স্পিকারের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে।
বিকল্প প্রস্তাব হিসেবে সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মতিতে স্পিকার নির্বাচনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ ক্ষেত্রে স্পিকারকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা এবং অন্যান্য উপদেষ্টা নিয়োগে দুই পক্ষের সম্মতির বিধান রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন কেউ কেউ।
কমিটির সভাপতি বলেন, বৈঠকে আসা সব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন তৈরির সময় সেগুলো তুলে ধরা হবে। প্রস্তাবগুলোর ভিত্তিতে আরও আলোচনা শেষে সংবিধান সংশোধনের বিল প্রস্তুত করা হতে পারে।
শনিবার সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে কমিটির নবম বৈঠক শুরু হয়। বৈঠক চলে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত। এতে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদেরা অংশ নেন।
সংবিধানে সর্বজনগ্রাহ্য সংশোধনীর খসড়া প্রণয়ন, সার্বিক সংস্কার এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞরা তাঁদের মতামত ও পরামর্শ দেন।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়। তবে সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির বিজয়ীরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের বিজয়ীরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য—দুই পদেই শপথ নেন।
গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনের মধ্যে বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করে। তবে এতে বিরোধী দলগুলো প্রতিনিধি দেয়নি।
সংবিধানের বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কার প্রস্তাব
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, কমিটির বৈঠকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এবং প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত বিষয়ে বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যকর করা, বিচারক নিয়োগ আইন এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়েও মতামত এসেছে।
সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সীমাবদ্ধতা শিথিল করার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল এবং আস্থা বা অনাস্থা ভোটের মতো বিষয় ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়া ও ভিন্নমত জানানোর অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও মতামত এসেছে বলে জানান কমিটির সভাপতি।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে আগের সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে কিছু ত্রুটি থাকায় সেটিকে আইনে পরিণত করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, বিভিন্ন কমিশন ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। এ ক্ষেত্রে অন্তত ছয়টি প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
কমিটির প্রতিবেদন সংকলনের কাজ আগামী কিছুদিনের মধ্যে শুরু হতে পারে। পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং তাদের মতামত নেওয়ার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।