বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করেছে। পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে আজ মঙ্গলবার থেকে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) প্রবেশ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশ করানো বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের আগে শেষ গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। জ্বালানি বসানোর পর তাপ উৎপন্ন হবে, সেই তাপে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে টারবাইন ঘুরাবে এবং সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শেষে আগামী আগস্টে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং রুশ সংস্থা Rosatom-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হবেন International Atomic Energy Agency-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি।
দেশের সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প হিসেবে পরিচিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের মাধ্যমে এখানে ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রথম ইউনিটে ১৬৩টি জ্বালানি বান্ডিল ব্যবহার করা হবে, যেখানে প্রতিটি বান্ডিলে ৩১২টি জ্বালানি রড রয়েছে। একবার জ্বালানি স্থাপন করলে প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানান, রূপপুর থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের মোট চাহিদার প্রায় ১০-১২ শতাংশ পূরণ করবে। জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় কম খরচে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।
ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি অত্যন্ত তেজস্ক্রিয় হওয়ায় তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করা হবে। ব্যবহৃত জ্বালানি রাশিয়ায় ফেরত নেওয়া হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক সংস্থার নজরদারিতে থাকবে।
জ্বালানি প্রবেশ ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কয়েক মাস সময় লাগবে। ধাপে ধাপে চুল্লির উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করে প্রথমে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে, এরপর জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে। পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যেতে প্রায় ১০ মাস সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের ধারণা প্রথম আসে ১৯৬১ সালে। স্বাধীনতার পর ১৯৯৫ সালের জাতীয় জ্বালানি নীতিতে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে কার্বন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। এটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বছরে প্রায় দুই কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমাতে সহায়তা করবে। প্রকল্পে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংকটসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের কাজ পিছিয়েছে। বর্তমানে প্রথম ইউনিট ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এবং দ্বিতীয় ইউনিট ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন একটি বড় অর্জন হলেও নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রূপপুরে জ্বালানি প্রবেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি নতুন যুগে প্রবেশ করল। তবে এই অর্জনের প্রকৃত সুফল মিলবে যখন জাতীয় গ্রিডে স্থিতিশীলভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়