
তীব্র জ্বালানি সংকটের প্রভাবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বাড়ছে লোডশেডিং। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প উৎস হিসেবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি সরকারের মেয়াদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে রুফটপ সোলার ব্যবস্থায়। বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনার ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। উৎপাদিত বিদ্যুতের অতিরিক্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ দিতে নেট মিটারিং ব্যবস্থাকেও আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’-এর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রুফটপ সোলার থেকে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে সার্ভিস প্রোভাইডার নিয়োগ ও তালিকাভুক্ত করবে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো। এসব প্রতিষ্ঠান সৌর প্যানেল স্থাপন থেকে শুরু করে বিনিয়োগ, কারিগরি সহায়তা, গ্রাহকসেবা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে।
এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে কর ও শুল্ক সুবিধা, স্বল্পসুদের ঋণ এবং স্টার্টআপ ফান্ড দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মতভাবে অর্জন করতে হলে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
বিপুলসংখ্যক ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। সহজ শর্তে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে উদ্যোগটি গতি হারাতে পারে।
এ ছাড়া সৌর প্যানেল, ইনভার্টারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষিত কারিগরি কর্মী প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ টেকনিশিয়ান তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
নিম্নমানের প্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। তাই সরঞ্জামের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সৌরবিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ, নেট মিটারিংয়ের কার্যকর পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দায়িত্ব ও ভূমিকা আরও স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি সার্ভিস প্রোভাইডারদের কাজের মান নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি, অডিট এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কাঠামো থাকা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নীতিগতভাবে রুফটপ সোলার বাধ্যতামূলক করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। সহজ অর্থায়ন, মানসম্মত সরঞ্জাম ও সেবা, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি ও স্পষ্ট নীতিমালা নিশ্চিত করা গেলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে মানুষের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে।
সরকারের আশা, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন বিনিয়োগ, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা