দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের Bagerhat জেলার Morelganj উপজেলার এক মানবিক গল্পের নাম বিধান চন্দ্র রায়। জন্ম থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এই ব্যক্তি গত তিন দশক ধরে বৃদ্ধ মাকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তার পাশে অস্থায়ী টোং ঘরে বসবাস করছেন। দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতার মাঝেও থেমে নেই তার জীবনসংগ্রাম।
মঙ্গলবার সরেজমিনে Jiudhara Union-এর পালেরখা গ্রামে গিয়ে জানা যায়, মৃত লক্ষীকান্ত রায়ের ছেলে বিধান চন্দ্র রায় (৬০) জন্ম থেকেই চোখে দেখতে পান না। পৈত্রিক কোনো জমি না থাকায় দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সরকারি জায়গায় একটি ছোট টোং ঘর তৈরি করে বসবাস করে আসছিলেন। তার একমাত্র সঙ্গী ৮৫ বছর বয়সী মা শান্তি রানী রায়।
অভাবের সংসারে নেই কোনো স্বাচ্ছন্দ্য। টোং ঘরের সামনে ছোট একটি দোকান বসিয়ে চকলেট, বিস্কুটসহ সামান্য পণ্য বিক্রি করেন বিধান। সেই আয় দিয়েই কোনোভাবে চলে মা-ছেলের দিনযাপন—কখনো দু’বেলা খাবার জোটে, আবার কখনো না খেয়েও থাকতে হয়।
চোখে দেখতে না পারলেও তার অনুভূতি ও মেধা বিস্ময়কর। স্পর্শেই টাকা চিনতে পারেন, আর মানুষের কণ্ঠ ও আচরণ বুঝে নিতে পারেন সহজেই। জীবনের কঠিন বাস্তবতাই যেন তাকে দিয়েছে ভিন্ন এক দৃষ্টিশক্তি।
এই সংগ্রামের আরেকটি অধ্যায় তার মা শান্তি রানী। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও ছেলেকে আগলে রেখেছেন স্নেহ ও মমতায়। মা-ছেলের এই সম্পর্ক দারিদ্র্যকেও যেন হার মানায়।
স্থানীয়দের মতে, আগে টোং দোকানে কিছুটা বেচাকেনা হলেও এখন তা অনেক কমে গেছে। এতে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সমাজসেবক আলী আমীন নিয়মিত মানবিক সহায়তা হিসেবে প্রতি মাসে এক বস্তা চাল দিয়ে থাকেন। এছাড়া সরকারি সহায়তা হিসেবে মা পান বয়স্ক ভাতা এবং বিধান পান প্রতিবন্ধী ভাতা, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
সম্প্রতি খাল খনন প্রকল্পের কাজ শুরু হলে তাদের টোং ঘরটি ভেঙে দেওয়া হয়। বর্তমানে স্থানীয়দের সহযোগিতায় পাশেই পলিথিন টানিয়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তারা। ঝড়-বৃষ্টি বা বন্যা এলেই অনিশ্চয়তায় কাটে দিন।
বিধান রায় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “বাবার কোনো ভিটা-মাটি পাইনি। ৩০ বছর ধরে এভাবেই আছি। নিজের সুখ চাই না, শুধু মাকে নিয়ে একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা Habibullah জানান, খাল খনন প্রকল্পের কারণে ঘরটি সরানো হয়েছে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, ভূমিহীন এই পরিবারটির জন্য সরকারি উদ্যোগে একটি স্থায়ী ঘরের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও মানবিক সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিধান রায়ের গল্প শুধু একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের সংগ্রামের কাহিনি নয়—এটি গ্রামীণ বাংলাদেশের বাস্তবতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি, যেখানে আজও একটি পরিবারের স্বপ্ন সীমাবদ্ধ একটি নিরাপদ আশ্রয়ে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়