দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাঝে মধ্যে ‘লাশ চুরি’ বা মরদেহ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টার অভিযোগও সামনে আসে। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও এর পেছনে মূলত কুসংস্কার, গুজব এবং কিছু ক্ষেত্রে অসাধু চক্রের স্বার্থ কাজ করে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বজ্রপাতে মৃত মানুষের শরীরে কোনো অলৌকিক শক্তি বা বিশেষ উপাদান থেকে যায়—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বজ্রপাত আসলে উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক স্রোত, যা শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মারাত্মক ক্ষতি করে। মৃত্যুর পর শরীরে কোনো অতিরিক্ত শক্তি সংরক্ষিত থাকে না।
তবে গ্রামাঞ্চলসহ কিছু এলাকায় এখনো নানা লোকবিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। কোথাও মনে করা হয়, বজ্রপাতে মৃত মানুষের শরীরের অংশ বা ব্যবহৃত জিনিস তাবিজ, ঝাড়ফুঁক বা তথাকথিত কালোজাদুর কাজে ব্যবহার করা যায়। এই বিশ্বাসকে ঘিরেই কিছু অসাধু চক্র লাশ চুরি বা মরদেহের প্রতি অবমাননাকর আচরণে জড়াতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা জানান, ‘লাশ চুরি’ সংক্রান্ত সব খবরই যে সংগঠিত অপরাধ—তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব কিংবা সামাজিক আতঙ্ক থেকেও গুজব ছড়ায়। আবার কোথাও মরদেহ দ্রুত দাফন বা স্থানান্তরের ঘটনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বজ্রপাতের মতো আকস্মিক মৃত্যু মানুষের মনে ভয় ও রহস্য তৈরি করে। সেই ভয় থেকেই জন্ম নেয় অলৌকিক ব্যাখ্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এসব বিশ্বাস আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সাবেক প্রধান সোহেল মাহমুদ জানান, ইলেকট্রিক শকে মৃত্যু হওয়া দেহ এবং বজ্রপাতে মৃত্যু হওয়া দেহের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, বজ্রপাতে মৃত্যু হলে দ্রুত প্রশাসনকে জানানো, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং গুজবে কান না দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো গেলে লাশ চুরি নিয়ে অযথা আতঙ্ক ও কুসংস্কার কমানো সম্ভব।
বজ্রপাত কীভাবে ঘটে
বজ্রপাত সৃষ্টির জন্য সাধারণত তিনটি উপাদান প্রয়োজন হয়—বাতাসের আর্দ্রতা, অস্থিতিশীল বায়ু এবং ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ। সমুদ্র থেকে বাষ্পীভূত পানি বাতাসে মিশে মেঘ তৈরি করে, যা বজ্রপাতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে।
বজ্রপাতের সময় বায়ুর তাপমাত্রা প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এতে বাতাস দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে হঠাৎ প্রসারিত হয় এবং শক্তিশালী শকওয়েভ তৈরি করে। এই শকওয়েভই আমরা বজ্রধ্বনি হিসেবে শুনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৃতদেহের প্রতি সম্মান রক্ষা এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুজবের বদলে তথ্যভিত্তিক সচেতনতা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়