পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ সফরে গেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। শুক্রবার (স্থানীয় সময়) একটি ছোট প্রতিনিধি দল নিয়ে তিনি সেখানে পৌঁছান। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানি প্রতিনিধিদলের সফরকে কেন্দ্র করে রাজধানী ইসলামাবাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কূটনৈতিক এই সফরকে ঘিরে দেশটির প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে।

ইসলামাবাদে পৌঁছানোর পর আরাগচি ও তার প্রতিনিধিদলের সদস্যরা সরাসরি সেরেনা হোটেল-এ যান। সেখানে তিনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। এই বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে, ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার জেরে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল-এর মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। প্রায় ৪০ দিন ধরে চলা এই সংঘাত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। পরবর্তীতে গত ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়, যা পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত করে।
এই প্রেক্ষাপটে, গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম দফা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ।
দীর্ঘ প্রায় ২১ ঘণ্টার আলোচনার পরও ওই সংলাপ থেকে কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর ছাড়াই বৈঠক শেষ হয় এবং উভয় পক্ষই নিজ নিজ দেশে ফিরে যায়। কূটনৈতিক মহলে এই সংলাপকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও, ফলাফল না আসায় নতুন করে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
বর্তমানে ইসলামাবাদে সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা সংলাপের প্রস্তুতি চলছে বলে পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। তবে এবার প্রতিনিধিদলে কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নতুন এই দফায় ইরানের প্রতিনিধিদলে মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ নেই এবং মার্কিন প্রতিনিধিদলেও অনুপস্থিত থাকছেন জে ডি ভ্যান্স। ফলে উভয় পক্ষই নতুন কৌশল ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনায় বসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বের এই পরিবর্তন আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। পূর্ববর্তী সংলাপের ব্যর্থতার পর এবার উভয় পক্ষ আরও নমনীয় অবস্থান নিতে পারে—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে, কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তাসংস্থা জানিয়েছে, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর মধ্যে টেলিফোনে কথা হয়েছে। ওই আলোচনায় কাতারের আমির পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।
কাতার দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই পাকিস্তানের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই সংলাপ প্রক্রিয়ায় দোহার সমর্থনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামাবাদকে কেন্দ্র করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপের এই নতুন উদ্যোগ সফল হলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে পারমাণবিক ইস্যু ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে এই ধরনের আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচির এই সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা সংলাপ আদৌ কতটা ফলপ্রসূ হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।