রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে দেশের জ্বালানি খাত, আমলাতন্ত্রের ভূমিকা এবং নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের কিছু আমলা বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষায় পরোক্ষভাবে কাজ করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
রোববার (৩ মে) রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তা: বর্তমান সংকট এবং ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কিছু আমলা তাদের সরকারি অবস্থানের প্রভাব ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কিছু বেসরকারি কোম্পানির পক্ষে কাজ করছেন। তার দাবি, এসব আমলা জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেন, যা সাধারণ মানুষের চেয়ে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর জন্য বেশি লাভজনক।
তিনি জানান, জাতীয় জ্বালানি বিষয়ক একটি কমিটিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, কীভাবে কিছু কর্মকর্তা নির্দিষ্ট ধরনের জ্বালানি আমদানির পক্ষে জোরালো সুপারিশ করেন। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং ভারী জ্বালানি তেল (এইচএফও) আমদানির ক্ষেত্রে এমন প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সংশ্লিষ্টরা যুক্তি দেন, এসব জ্বালানি আমদানি করলে দেশের জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান সম্ভব।
তবে হাসনাত আবদুল্লাহর মতে, এসব সুপারিশের পেছনে অনেক সময় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ জড়িত থাকে। তিনি আরও বলেন, অবসরের পর অনেক আমলাকে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি কোম্পানিতে উচ্চপদে চাকরি নিতে দেখা যায়, যা স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তোলে।
ডিজেল আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, স্পট মার্কেট থেকে তেল কেনার জন্য আমলারা সরকারকে উৎসাহিত করেন, যার ফলে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠী লাভবান হয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদে চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
রাষ্ট্র সংস্কারের প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির এই নেতা বলেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী বিচার বিভাগ, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা জরুরি ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সংস্কার কার্যক্রম দৃশ্যমান নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, রাষ্ট্রীয় সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর শাসন ব্যবস্থার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমলাতন্ত্রের একটি প্রভাবশালী অংশ যদি করপোরেট স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে সাধারণ জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। তাই নীতিনির্ধারণে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মত দেন।
জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ এখনো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি দেশের ওপর পড়ে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোর কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, ভারত ও পাকিস্তান নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব দেশ সৌর ও বায়ু শক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্য এনেছে, ফলে বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম পড়ছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে গত এক দশকেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও জ্বালানি সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে সংকট পুরোপুরি কাটছে না। এর ফলে লোডশেডিং, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
সবশেষে তিনি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেন।
সেমিনারে উপস্থিত অন্যান্য বক্তারাও জ্বালানি খাতের টেকসই উন্নয়নে পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়