নগর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ফুটপাত। এটি মূলত পথচারীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্য নির্মিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে ফুটপাতে সাদা দাগ টেনে হকারদের বসার নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করার উদ্যোগ নতুন করে জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই উদ্যোগকে কেউ দেখছেন বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়াস হিসেবে, আবার অনেকে মনে করছেন—এটি অবৈধতাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল।
প্রশ্ন উঠছে, যদি ফুটপাত হকারদের জন্যই নির্ধারিত হয়, তাহলে পূর্বে কেন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলো? আর যদি উচ্ছেদ প্রয়োজনীয় হয়ে থাকে, তাহলে এখন কেন পুনরায় একই স্থানে ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে? এই দ্বৈত অবস্থান নগর ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতা ও নীতিগত স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে।
বাস্তবতা হলো, ফুটপাত দখল হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ পথচারীরা। স্কুলগামী শিশু, বয়স্ক মানুষ, নারী এবং শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা নিরাপদে চলাচলের সুযোগ হারান। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে সড়কে নামতে হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে ফুটপাতের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।
অন্যদিকে, হকারদের বিষয়টিও একপাক্ষিকভাবে বিবেচনা করা যায় না। শহরের একটি বড় অংশের মানুষ জীবিকার তাগিদে ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। তাদের জন্য হকারি একটি সহজলভ্য আয়ের পথ। তাই হঠাৎ উচ্ছেদ অনেকের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই হয়তো কর্তৃপক্ষ একটি ‘সমন্বয়মূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে হকারদের বসার সুযোগ দিতে চাইছে।
তবে এখানেই মূল প্রশ্নটি আরও গভীর হয়—যারা ফুটপাতে বসে ব্যবসা করছেন, তারা সবাই কি সত্যিই প্রান্তিক ও অসহায়? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ফুটপাতের ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে। স্থায়ী কাঠামো তৈরি, পণ্য মজুদ এবং দৈনিক বড় অঙ্কের লেনদেন—এসবই ইঙ্গিত দেয় যে এই খাতে কেবল দরিদ্র মানুষ নয়, বরং সংগঠিত ও পুঁজিসম্পন্ন একটি গোষ্ঠীও সক্রিয়। ফলে “গরিবের জীবিকা” যুক্তিটি সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, সেটিও পর্যালোচনার দাবি রাখে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—হকারদের জন্য পূর্বে যে হকার মার্কেট বা পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো তৈরি করা হয়েছিল, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা। অভিযোগ রয়েছে, এসব মার্কেটে প্রকৃত হকারদের পরিবর্তে অন্যান্য ব্যবসায়ীরা স্থান দখল করে নিয়েছেন। ফলে যাদের জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তারা এখনো ফুটপাতেই রয়ে গেছেন। যদি এসব মার্কেট যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা যেত এবং প্রকৃত হকারদের সেখানে স্থানান্তর করা হতো, তাহলে হয়তো ফুটপাত দখলের এই সমস্যা অনেকটাই কমে আসত।
নগর পরিকল্পনায় একটি মৌলিক নীতি হলো—প্রত্যেক শ্রেণির মানুষের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। কিন্তু সেই ভারসাম্য যদি এমন হয় যে একটি পক্ষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান হতে পারে না। ফুটপাত দখল করে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া, যদিও তা নির্দিষ্ট দাগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হোক, তবুও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ নিয়ন্ত্রণের অভাবে এই সীমাবদ্ধতা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান হতে পারে সুপরিকল্পিত পুনর্বাসন, কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন। প্রথমত, প্রকৃত হকারদের সঠিকভাবে শনাক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাদের জন্য বিকল্প ব্যবসার স্থান নিশ্চিত করতে হবে—যেখানে ভাড়া সহনীয় হবে এবং ব্যবসার পরিবেশ উপযোগী থাকবে। তৃতীয়ত, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত মনিটরিং ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। একদিকে উচ্ছেদ, অন্যদিকে পুনরায় বসার অনুমতি—এই ধরনের পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং আইনের প্রতি আস্থাও কমিয়ে দেয়।
শহর সবার—হকার, ব্যবসায়ী, পথচারী—সকলেরই। কিন্তু সেই শহরে চলাচলের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সিটি কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। তাই ফুটপাতের ব্যবহার নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা অমূলক নয়। বরং এটি একটি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন—যার উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়