টেস্ট ক্রিকেটে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের জন্ম দিল বাংলাদেশ। সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দুর্দান্ত লড়াই শেষে পাকিস্তানকে ৭৮ রানে হারিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতে নিয়েছে টাইগাররা। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ।
বুধবার (২০ মে) পঞ্চম দিনের প্রথম সেশনে পাকিস্তানের শেষ প্রতিরোধ ভেঙে দেয় বাংলাদেশের বোলাররা। ৪৩৭ রানের কঠিন লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে সফরকারীরা শেষ পর্যন্ত ৯৭.২ ওভারে ৩৫৮ রানে অলআউট হয়। খুররম শাহজাদ শেষ ব্যাটার হিসেবে আউট হলে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত হয়।
এই জয়ের মাধ্যমে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চারটি টেস্ট ম্যাচ জয়ের কীর্তিও গড়েছে বাংলাদেশ। নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে অন্য কোনো দলের বিপক্ষে এত দীর্ঘ জয়ধারা আগে ছিল না টাইগারদের।
চতুর্থ দিন শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ছিল ৭ উইকেটে ৩১৭ রান। তখনও জয়ের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল ১২০ রান, আর বাংলাদেশের দরকার ছিল মাত্র তিন উইকেট।
পঞ্চম দিনের শুরুতে ব্যাট করতে নামেন আগের দিনের দুই অপরাজিত ব্যাটার মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খান। শুরুতেই বাংলাদেশ সুযোগ পেয়েছিল রিজওয়ানকে ফেরানোর। নাহিদ রানার বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়েছিলেন পাকিস্তানের উইকেটকিপার ব্যাটার। তবে সেই সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
জীবন পেয়ে রিজওয়ান আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। সাজিদ খানকে সঙ্গে নিয়ে অষ্টম উইকেটে গড়ে তোলেন গুরুত্বপূর্ণ জুটি। ধীরে ধীরে ম্যাচে ফেরার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে পাকিস্তান। দুজনের ব্যাটে অর্ধশতাধিক রানের জুটি গড়ে ওঠে এবং বাংলাদেশের শিবিরে চাপ তৈরি হয়।
তবে সেই প্রতিরোধ ভাঙেন অভিজ্ঞ স্পিনার তাইজুল ইসলাম। আক্রমণে এসে সাজিদ খানকে আউট করে নিজের পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি। সাজিদ ৩৬ বলে ২৮ রান করে বিদায় নেন।
এরপরও রিজওয়ান একপ্রান্ত আগলে রেখে লড়াই চালিয়ে যান। শতকের দিকেই এগোচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু শরিফুল ইসলামের বলে ক্যাচ তুলে দিয়ে ৯৪ রানে থামেন পাকিস্তানের এই ব্যাটার। ১৬৬ বলের ইনিংসে তিনি মারেন ১০টি চার।
শেষদিকে খুররম শাহজাদ ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে ওয়াইড লং অনে তানজিদ হাসানের হাতে ধরা পড়লে পাকিস্তানের ইনিংস শেষ হয়। অপরপ্রান্তে শূন্য রানে অপরাজিত ছিলেন মোহাম্মদ আব্বাস।
বাংলাদেশের জয়ের নায়ক ছিলেন বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। দীর্ঘ স্পেলে বল করে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপে বারবার আঘাত হানেন তিনি। ৩৪.২ ওভারে ১২০ রান খরচায় নেন ৬ উইকেট।
তাইজুলের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের পাশাপাশি গতি দিয়ে চাপ তৈরি করেন তরুণ পেসার নাহিদ রানা। তিনি তুলে নেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। এছাড়া শরিফুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ নেন একটি করে উইকেট।
সিলেটের উইকেটে স্পিন ও পেসের সমন্বিত আক্রমণে পুরো ম্যাচজুড়েই পাকিস্তানকে চাপে রেখেছিল বাংলাদেশ।
ম্যাচের শুরুতে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে তোলে ২৭৮ রান। দলের হয়ে দারুণ সেঞ্চুরি করেন লিটন দাস। তার ইনিংসের ওপর ভর করেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সংগ্রহ পায় স্বাগতিকরা।
জবাবে পাকিস্তান প্রথম ইনিংসে ২৩২ রানে থেমে যায়। ফলে ৪৬ রানের লিড পায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটাররা আরও আত্মবিশ্বাসী ক্রিকেট উপহার দেন। মুশফিকুর রহিম, শান্ত ও অন্যদের অবদানে বাংলাদেশ তোলে ৩৯০ রান।
ফলে পাকিস্তানের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৪৩৭ রান। চতুর্থ ইনিংসে এত বড় লক্ষ্য তাড়া করে জয়ের জন্য রেকর্ড গড়ার প্রয়োজন ছিল সফরকারীদের। শুরুতে কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের সামনে টিকতে পারেনি তারা।
এই সিরিজ জয়ের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বাংলাদেশের জন্য। প্রায় দুই বছর আগে পাকিস্তানের মাটিতে তাদেরকে টেস্ট সিরিজে হারিয়েছিল টাইগাররা। এবার নিজেদের ঘরের মাঠেও একই কীর্তি গড়ে পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করল বাংলাদেশ।
একসময় পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা পাঁচটি টেস্ট সিরিজ হেরেছিল বাংলাদেশ। সেই হতাশার অধ্যায় পেছনে ফেলে এখন নতুন ইতিহাস লিখছে টাইগাররা। টানা চার টেস্ট জয়ের এই অর্জন বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন আত্মবিশ্বাস যোগ করবে বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা।
ম্যাচ শেষে লিটন দাসকে ম্যাচসেরা ঘোষণা করা হয়। পুরো সিরিজে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের জন্য সিরিজসেরার পুরস্কার পান অভিজ্ঞ ব্যাটার মুশফিকুর রহিম।
বাংলাদেশ: ২৭৮ ও ৩৯০
পাকিস্তান: ২৩২ ও ৩৫৮
ফল: বাংলাদেশ ৭৮ রানে জয়ী
ম্যাচসেরা: Litton Das
সিরিজসেরা: Mushfiqur Rahim
সিরিজ ফল: বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে জয়ী
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়