প্রচার শুরুর আগেই নানা ইস্যুতে চারদিক থেকে চাপ বাড়ছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। প্রতীক বরাদ্দের আগেই লাগামহীন প্রচার, আচরণবিধির ধারাবাহিক লঙ্ঘন, পোস্টাল ব্যালট বিতর্ক, প্রার্থীদের ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যু এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে ভোটের মাঠ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঢিলেঢালা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অসহায়ত্ব এবং প্রার্থীদের আক্রমণাত্মক আচরণ। ফলে নির্বাচনের আগেই ইসির নিয়ন্ত্রণক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি শেষ হয়েছে গতকাল। আজ ও কাল প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে প্রতীক বরাদ্দের আগেই বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি ও প্রকাশ্যভাবে প্রচার চালাচ্ছেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা, যা আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
যদিও কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন শোকজ করছে, তাতে খুব একটা ফল দেখা যাচ্ছে না। বরং কোথাও কোথাও প্রার্থী ও সমর্থকদের সঙ্গে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। এতে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে অসহায়ত্ব বাড়ছে।
এরই একটি উদাহরণ দেখা গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে। প্রতীক বরাদ্দের আগেই নির্বাচনি উঠান বৈঠক করায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়ান স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় এবং ইসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
ভোটার ও রাজনৈতিক নেতাদের মতে, এখনই কঠোর অবস্থান না নিলে ভোটের দিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। কিশোরগঞ্জের এক ভোটার মারুফ খান বলেন, “ভোটের আগেই শক্ত বার্তা না দিলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না।”
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা গাজী আতাউর রহমান অভিযোগ করেন, মনোনয়ন যাচাইয়ে বৈষম্য হয়েছে এবং রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে একরকম মানদণ্ড দেখা যায়নি। এতে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বলেন, নির্বাচন একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ছোট অভিযোগ হলেও তা খতিয়ে দেখে জনগণকে জানাতে হবে। তা না হলে আস্থা নষ্ট হবে এবং পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
প্রথমবারের মতো ব্যাপক পরিসরে চালু হওয়া পোস্টাল ব্যালট নিয়েও বিতর্কে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। বিদেশে একাধিক ব্যালট পেপার এক বাসায় পাওয়ার ছবি ভাইরাল হওয়ার পর প্রশ্ন ওঠে স্বচ্ছতা নিয়ে। প্রতীক বিন্যাস, ব্যালটে প্রার্থীর নাম না থাকা এবং ভাঁজে প্রতীক ঢেকে যাওয়ার অভিযোগ তোলে বিএনপি।
চাপের মুখে অবস্থান বদলে দেশে ব্যবহারের জন্য আলাদা পোস্টাল ব্যালট ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা সংবিধান ও হাইকোর্টের আদেশের পরিপন্থী—এমন অভিযোগে সিইসির কাছে লিখিত আবেদন জমা পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কেবল ‘অঙ্গীকারনামা’র ভিত্তিতে প্রার্থিতা বৈধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঋণখেলাপি প্রার্থীদের ছাড় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে একাধিক দল।
পোস্টাল ব্যালট অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগে ইসির সামনে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছে ছাত্রদল। বিএনপিও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, “ভালো নির্বাচনের ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। যারা আচরণবিধি ভাঙছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে আমরা কোনো শঙ্কা দেখছি না।”
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়