আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সামনে কোনো আইনগত বাধা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
শনিবার (গতকাল) সকালে রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে বিভাগীয় কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সভাটির আয়োজন করে ঢাকা বিভাগীয় প্রশাসন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, এবারের গণভোট কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনা বা ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার এজেন্ডা নয়। এটি রক্তের অক্ষরে লেখা জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক রাষ্ট্র সংস্কারের এজেন্ডা, যা বাংলাদেশের সকল মানুষের। এই গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সম্মতি নেওয়া হবে—আগামী দিনে বাংলাদেশ কোন পথে চলবে, তা নির্ধারণের জন্য।
তিনি বলেন, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সাবেক বিচারপতি ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনায় একবাক্যে মত পাওয়া গেছে—গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ওপর কোনো আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই। যারা এ বিষয়ে বাধা রয়েছে বলে প্রচার করছে, তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে অথবা ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে বিষয়টি উত্থাপন করছে।
ঢাকা বিভাগের কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য) মনির হায়দার, বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও পূর্ত সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক।
সভায় বক্তব্যে আলী রীয়াজ বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যারা সংগ্রাম করেছেন, প্রাণ দিয়েছেন, জেল-জুলুম ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন—তারা আমাদের দুটি স্পষ্ট দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। একটি হলো ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র যেন আর ফিরে আসতে না পারে, সেই পথ রুদ্ধ করা। অন্যটি হলো ভবিষ্যতের বাংলাদেশের পথনকশা তৈরি করা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ২৭ থেকে ৩৭ বছরের নিচে। আগামী অন্তত ৪০ বছর দেশ কীভাবে চলবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সাফল্য ও সমৃদ্ধির দিকে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নন, একই সঙ্গে নাগরিকও। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকার দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। সেই দায়িত্বের আলোকে গণভোটে মানুষকে সচেতন করা ও ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করাও নাগরিক কর্তব্যের অংশ।
গণভোট নিয়ে বিদ্যমান বিভ্রান্তির প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ভোট নিয়ে অনাস্থার কারণে গণভোট অনেকের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। তাই জনগণকে ব্যালটে কীভাবে ভোট দিতে হবে এবং ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের অর্থ কী—তা স্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে। এ জন্য ব্যালটে থাকা ‘টিক চিহ্ন’কে প্রচারণার মূল প্রতীক হিসেবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সরকার তিনটি ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করছে—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। নির্বাচন সরকার আয়োজন করে না; সরকার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। একইভাবে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করে আদালত।
অতীতে এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সংবিধান সংশোধনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়। ভবিষ্যতে যেন সংবিধান সংশোধন ‘ছেলেখেলায়’ পরিণত না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই বর্তমান সংস্কারের মূল লক্ষ্য।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মনির হায়দার বলেন, সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৪৮টি সুপারিশ চারটি ক্যাটাগরিতে গণভোটে উপস্থাপন করা হবে। বাস্তবে প্রশ্নটি একটাই—আপনি কি জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষে, না বিপক্ষে?
তিনি বলেন, গণভোট ব্যর্থ হলে ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসবে, যার পরিণতি হবে ভয়াবহ। জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ এনে দিয়েছে। এখন গণভোটের মাধ্যমে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
সভায় ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়