বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়া, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে এই অগ্রগতির পরও দেশের দেড় কোটির বেশি মানুষ এখনো ‘তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা’র মধ্যে রয়েছে।
শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস (জিআরএফসি)’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করেছে Global Network Against Food Crises, যেখানে তথ্য সহায়তা দিয়েছে জাতিসংঘ, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO), বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (IFAD) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ছিল, যা গবেষণার আওতাভুক্ত জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ‘সংকটজনক পর্যায় ৩’-এ এবং প্রায় ৪০ লাখ মানুষ ‘জরুরি পর্যায় ৪’-এর খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল।
তবে ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে উচ্চমাত্রার খাদ্য সংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭৬ লাখ বা ৩২ শতাংশ কমেছে। এই অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও, ‘চরমভাবাপন্ন’ আবহাওয়া এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণে এ উন্নতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
এদিকে, বাংলাদেশের দুটি জেলায় আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর খাদ্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বিশেষ করে বন্যা এবং মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের খাদ্য নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্য সংকট তীব্র হয়েছে এমন ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি রয়েছে আফগানিস্তান, কঙ্গো, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া এবং ইয়েমেন।
প্রতিবেদনটি বলছে, সংঘাত ও চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে অনেক দেশে খাদ্য সংকট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বা আরও খারাপ হতে পারে। যদিও বাংলাদেশ ও সিরিয়ার মতো কিছু দেশে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবে আফগানিস্তান, কঙ্গো, মিয়ানমার ও জিম্বাবুয়ের মতো দেশে পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়েছে।
বাংলাদেশকে প্রতিবেদনে ‘মাঝারি মাত্রার পুষ্টি সংকটে’ থাকা দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি পুষ্টি সংকটে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা, দক্ষিণ সুদান, সুদান, আফগানিস্তান এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক।
এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তায় কিছু উন্নতি হলেও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থার অবনতি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সর্বাধিক বাস্তুচ্যুত মানুষের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়—শীর্ষে রয়েছে সুদান ও সিরিয়া। বাংলাদেশের পর রয়েছে কঙ্গো, নাইজেরিয়া ও মিয়ানমার।
বিশ্বব্যাপী চিত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ৪৭টি দেশ ও অঞ্চলে প্রায় ২৬ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ছিল। এর মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ ‘বিপর্যয়কর’ বা দুর্ভিক্ষ-সমতুল্য অবস্থায় (পর্যায় ৫) পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই বছরে দুটি দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে—ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা এবং সুদান। এছাড়া দক্ষিণ সুদান ও ইয়েমেনের কিছু অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের উচ্চ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
খাদ্য ও পুষ্টি সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা দ্রুত কমে যাওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত পরিস্থিতি ভবিষ্যতে সংকট আরও গভীর করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে প্রতিবেদনে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনে খরচ বেড়ে যাওয়াও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
এ প্রসঙ্গে আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, এই প্রতিবেদনটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি জরুরি আহ্বান। জীবন রক্ষাকারী সহায়তায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সংঘাতের অবসান ঘটাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জাগ্রত করা এখন সময়ের দাবি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষের জীবনে সীমাহীন দুর্ভোগ ডেকে আনছে, যা মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়