নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা-র ওপর হামলা, তার ব্যবহৃত গাড়ি ভাঙচুর এবং তাকে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সন্ধ্যায় পূর্বধলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের আতকাপাড়া এলাকায় অবস্থিত গিরিপথ ফিলিং স্টেশনে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ফিলিং স্টেশনটি স্বাভাবিকভাবে যানবাহনে জ্বালানি সরবরাহ করছিল। এরপর পাম্পটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে সেখানে যান। পাম্পের মালিক মো. কামালের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার পর তিনি পাশের একটি কক্ষে নামাজ আদায়ের জন্য প্রবেশ করেন।
এ সময় পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রায় ১৫টি মোটরসাইকেলে করে ২০ থেকে ২৫ জন যুবক সেখানে এসে জ্বালানি নেওয়ার চেষ্টা করেন। পাম্প বন্ধ থাকায় তাদের সঙ্গে কর্মচারীদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা দ্রুত উত্তেজনায় রূপ নেয়। একপর্যায়ে ওই যুবকেরা সংসদ সদস্যের গাড়ি লক্ষ্য করে ভাঙচুর চালায়।
নামাজ শেষে কক্ষ থেকে বের হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, বিক্ষুব্ধ ওই যুবকেরা সংসদ সদস্যকে ধাওয়া করে এবং তাকে কিছু সময়ের জন্য অবরুদ্ধ করে রাখে। এ সময় সেখানে দায়িত্বরত কয়েকজন পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও তারা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হননি।
খবর পেয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা পর পূর্বধলা থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সংসদ সদস্যকে উদ্ধার করে। উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সংসদ সদস্যকে উদ্ধার করেছে। তিনি বলেন, “ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।” আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছে বলেও জানান তিনি।
ঘটনার পর সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করেন, এ হামলার পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জড়িত। তিনি দাবি করেন, “আমি পাম্পে তেল নিতে গিয়েছিলাম। তখন বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের ২০-২৫ জন নেতা-কর্মী আমার ওপর হামলা চালায়, আমার গাড়ি ভাঙচুর করে এবং আমাকে অবরুদ্ধ করে রাখে।” তিনি আরও বলেন, তার সমর্থকেরা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা তাদের ওপরও আক্রমণ চালায়।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নেত্রকোনা জেলা বিএনপির নেতারা। আসনটির সাবেক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং পূর্বধলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু তাহের তালুকদার বলেন, “আমি ঘটনাটি শুনেছি, কিন্তু কারা এর সঙ্গে জড়িত তা আমার জানা নেই। আমাদের দলের কোনো নেতা-কর্মী এতে জড়িত নয়।” তিনি ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক। তারা মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাছুম মোস্তফা জয়ী হন। তিনি মোট ৮২ হাজার ১৭৭ ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবু তাহের তালুকদার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছিলেন ৭৯ হাজার ৪১২ ভোট।
ঘটনার পর এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নজরদারি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা জানিয়েছেন, তিনি আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়