গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাটে ১৪৫ কোটি টাকার আধুনিক ফেরিঘাট টার্মিনাল নির্মিত হলেও সেখানে কোনো ফেরি চলাচল করছে না। নদীর নাব্য সংকট, বারবার ব্যর্থ ড্রেজিং এবং পরিবর্তিত নদীপথের কারণে প্রকল্পটি এখন কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয়দের কাছে এটি এখন এক ব্যর্থ অবকাঠামোর প্রতীক।
একসময় যেখানে যাত্রী ও নৌযানের ভিড় ছিল, সেখানে এখন শুধু বালুচর আর ফাঁকা ভবন। টার্মিনাল ভবন, টোল বুথ, পুলিশ ও আনসার ব্যারাকসহ সব অবকাঠামো থাকলেও নেই কোনো নিয়মিত ফেরি চলাচল। বছরে মাত্র কয়েক মাস ছোট নৌকায় সীমিত যাতায়াত হয়, যা প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এই ঘাটটি সচল হলে উত্তরাঞ্চলের অন্তত আট জেলার মানুষের যাতায়াত সহজ হতো। নৌকার মাঝি জহুরুল ইসলাম বলেন, বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে একটি সেতু নির্মিত হলে উত্তরবঙ্গের মানুষের ভোগান্তি অনেক কমে যেত।
ঐতিহাসিকভাবে বালাসী-বাহাদুরাবাদ নৌরুট ছিল উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। ব্রিটিশ আমলে এই পথে ট্রেন ও ফেরির সমন্বয়ে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ হতো। পরে নদীর নাব্যতা সংকট ও চর জাগার কারণে ধীরে ধীরে এই রুট অচল হয়ে পড়ে।
২০১৭ সালে সরকার ফেরিঘাট আধুনিকায়নের প্রকল্প নেয়, যার ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১৪৫ কোটি টাকা। ২৬ কিলোমিটার নদী খননসহ টার্মিনাল নির্মাণ করা হলেও নদীর পরিবর্তনশীল প্রকৃতির কারণে ফেরি চালানো সম্ভব হয়নি। প্রকৌশলীদের মতে, নদীর চর দ্রুত ভরাট হয়ে যাওয়ায় নিয়মিত ড্রেজিং করেও নৌপথ সচল রাখা যায় না।
বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা জানান, রাতের ড্রেজিংয়ের পর সকালে আবার চর পড়ে যায়, ফলে স্থায়ী নৌপথ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্পটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নৌরুট সচল রাখতে যে পরিমাণ খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন, তার ব্যয় একটি পূর্ণাঙ্গ সেতু নির্মাণের কাছাকাছি বা তার চেয়েও বেশি। তাই অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই রুটকে টেকসই সমাধান হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
এ অবস্থায় স্থানীয়দের প্রধান দাবি এখন বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে একটি দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ। তাদের মতে, এই সেতু নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁওসহ কয়েকটি জেলার দূরত্ব ১২০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত কমে যাবে।
বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের যানবাহন শুধু বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সেখানে প্রায়ই দীর্ঘ যানজট দেখা দেয়। দ্বিতীয় সেতু হলে এই চাপ কমবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সেতু নির্মাণের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং বিষয়টি পর্যালোচনাধীন রয়েছে। পাশাপাশি বালাসীঘাটকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে উন্নয়নের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে স্থানীয়দের মতে, শুধু পর্যটন নয়, টেকসই সমাধান হলো একটি আধুনিক সেতু নির্মাণ। কারণ বর্তমান নৌরুট বারবার ব্যর্থ হওয়ায় কোটি টাকার প্রকল্পও কোনো কার্যকর ফল দিতে পারেনি।
সব মিলিয়ে বালাসীঘাট এখন একদিকে ব্যর্থ অবকাঠামোর উদাহরণ, অন্যদিকে নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয়দের প্রত্যাশা—ভবিষ্যতে পরিকল্পিতভাবে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসবে বাস্তব পরিবর্তন।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়