অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী সোমবার (২০ এপ্রিল) তারেক রহমান বগুড়ায় গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিটি করপোরেশনের উদ্বোধন করবেন বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো সফরসূচি অনুযায়ী, সোমবার বেলা ১১টায় তিনি বগুড়া সিটি করপোরেশনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করবেন। প্রটোকল অফিসার-১ উজ্জ্বল হোসেনের বরাতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ পৌর এলাকার একটি নতুন প্রশাসনিক রূপান্তরের সূচনা হবে।
বগুড়া পৌরসভার সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার এই যাত্রা নতুন নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, দাবি এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতার ইতিহাস। সর্বশেষ ২০০৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর সরকারের আমলে পৌরসভার চারপাশের ৪৮টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত করে এর আয়তন ৬৯ দশমিক ৫৬ বর্গকিলোমিটারে উন্নীত করা হয়। একই সঙ্গে ওয়ার্ড সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ২১ করা হয়। তখন থেকেই বগুড়াকে ভবিষ্যতে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
তবে নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেই পরিকল্পনা দীর্ঘদিন বাস্তবায়ন হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি ওঠার পরও বিষয়টি আলোর মুখ দেখেনি। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভা—যেমন রংপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর—সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলেও বগুড়া পিছিয়ে ছিল। অথচ জনসংখ্যা, আয়তন এবং অবকাঠামোগত দিক থেকে অনেক আগেই প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেছিল এই পৌরসভা।
নাগরিক সমাজের মতে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই এতদিন বগুড়ার উন্নয়ন থমকে ছিল। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক হোসনা আফরোজা বগুড়াকে সিটি করপোরেশন ঘোষণার প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা পরবর্তী প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
এর ধারাবাহিকতায় গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মতামত ও আপত্তি সংগ্রহ করে তা নিষ্পত্তির পর চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর গত বছরের ২০ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ্ খান বগুড়া সফর করে পৌরসভার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। সে সময় তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের আগেই বগুড়াকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করা হবে। যদিও নির্ধারিত সময়ে তা বাস্তবায়ন হয়নি।
পরবর্তীতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস–সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (প্রাক-নিকার) সচিব কমিটির বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক নোটিশে জানানো হয়, বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীতকরণসহ মোট আটটি উন্নয়ন প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বগুড়াকে সিটি করপোরেশন হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব অনুমোদিত হয়, যা এখন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও বগুড়া-২ আসনের সংসদ সদস্য মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী বগুড়ায় এসে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন। তার মতে, এটি বগুড়াবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ করতে যাচ্ছে এবং এর মাধ্যমে নগর উন্নয়নে নতুন গতি আসবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সিটি করপোরেশন হিসেবে ঘোষিত হলে বগুড়ার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নাগরিক সেবা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। উন্নত সড়কব্যবস্থা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি সরবরাহ ও নগর পরিকল্পনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
সব মিলিয়ে, বগুড়ার জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে অবশেষে সিটি করপোরেশন হিসেবে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে এই জনপদ, যা ভবিষ্যতে উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নগর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করবে।