সারা দেশে কঠোর নিরাপত্তা ও নিবিড় নজরদারির মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে একযোগে এই পরীক্ষা শুরু হয়। চলতি বছরে ১৮ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী এই গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় আয়োজন হিসেবে বিবেচিত।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্যে ছাত্রের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার এবং ছাত্রীর সংখ্যা ৯ লাখ ২৭ হাজারের বেশি। গত বছরের তুলনায় পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমলেও সামগ্রিক অংশগ্রহণ এখনও উল্লেখযোগ্য।
দেশব্যাপী প্রায় ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানবিক বিভাগে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে বিজ্ঞান বিভাগ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ।
অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে তিন লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে। এই তিনটি ধারার পরীক্ষার্থীদের সমন্বয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি বড় শিক্ষামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এবারের পরীক্ষা ঘিরে অনিয়ম প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে শিক্ষা প্রশাসন। প্রশ্নফাঁস, নকল বা অন্য কোনো অসদুপায় ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দেশের সব পরীক্ষা কেন্দ্রকে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে, যাতে প্রতিটি কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
এছাড়া, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ টিম মোতায়েন করা হয়েছে, যারা হঠাৎ করে কেন্দ্র পরিদর্শন করে অনিয়ম শনাক্তে কাজ করছে।
পরীক্ষাকেন্দ্রের আশপাশে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে, যাতে বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পরীক্ষার সময় কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস, যেমন মোবাইল ফোন, স্মার্ট ঘড়ি বা ব্লুটুথ ডিভাইস বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরীক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে এই নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কঠোর নিরাপত্তার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষা কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, বসার ব্যবস্থা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অনেক কেন্দ্রে বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেকোনো সময় হঠাৎ করে কেন্দ্র পরিদর্শনে যেতে পারেন শিক্ষা বোর্ড বা প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা। এর মাধ্যমে পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অভিভাবক এবং শিক্ষকরা পরীক্ষার্থীদের প্রতি শান্ত ও মনোযোগী থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। পরীক্ষাকে ঘিরে কোনো গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রতি কান না দেওয়ার জন্যও সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত ভুয়া তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে।
এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। তাই পরীক্ষার সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ আয়োজন নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের আয়োজন থেকে স্পষ্ট, শিক্ষা প্রশাসন অনিয়ম প্রতিরোধে আগের তুলনায় আরও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা এবং প্রশাসনিক তৎপরতা মিলিয়ে একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কঠোর নিরাপত্তা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশে শুরু হয়েছে। এখন সবার প্রত্যাশা, এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পুরো পরীক্ষাপর্ব সফলভাবে সম্পন্ন হবে এবং শিক্ষার্থীরা তাদের মেধা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন পাবে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়