কিশোরগঞ্জের হাওড় এলাকায় প্রস্তাবিত আলোচিত উড়াল সড়ক নির্মাণ প্রকল্পটি অবশেষে বাতিলের পথে। প্রায় ৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এই প্রকল্পটি শুরু থেকেই বিতর্কের মুখে ছিল, বিশেষ করে পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বুধবার মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটি ‘অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত’ করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকল্পটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সূত্র জানায়, আব্দুল হামিদ-এর নিজ এলাকা কিশোরগঞ্জের মিঠামইন হাওড়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রায় ৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। সে সময়ের সরকার প্রধান শেখ হাসিনা-এর সরকার বিদায়ের প্রাক্কালে এটিকে উপহার প্রকল্প হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।
প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রামসহ হাওড় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার সঙ্গে জেলা সদর ও রাজধানী ঢাকার সার্বক্ষণিক সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা। এ জন্য হাওড়ের ওপর ১৫.৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়াল সড়ক নির্মাণ, সেতু, কালভার্ট, টোল প্লাজাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ২.৭২ শতাংশ। বাস্তব অগ্রগতি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু জমি অধিগ্রহণেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। ফলে প্রকল্পটি বাতিল হওয়ায় ব্যয় হওয়া অর্থ কার্যত অপচয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রকল্প বাতিলের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পরিবেশগত উদ্বেগ। হাওড় অঞ্চলের সংবেদনশীল জলাভূমিতে উড়াল সড়ক নির্মাণ করলে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় পরিবেশবিদরা শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন।
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সেতু বিভাগের প্রকল্প পর্যালোচনা সভায় বিষয়টি গুরুত্ব পায়। ওই সভায় হাওড় অঞ্চলের জলাভূমিতে সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরা হয় এবং প্রকল্পটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্পটি সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন না করেই ‘অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় প্রকল্পের মূল ডিপিপি সংশোধন করে ব্যয় কমিয়ে ১৫৩ কোটি ৯২ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে, যা অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ হ্রাস। সংশোধিত প্রস্তাবে উড়াল সড়ক নির্মাণসহ মূল অবকাঠামোগত কাজগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় থেকেই ব্যয়ের অস্বাভাবিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। জানা যায়, প্রতি কিলোমিটার উড়াল সড়ক নির্মাণে অন্যান্য প্রকল্পে যেখানে ১০০ থেকে ১৪৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়, সেখানে এই প্রকল্পে ধরা হয়েছিল প্রায় ১৮১ কোটি টাকা। সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রেও ব্যয় ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি।
পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শুরুতে যুক্তি দিয়েছিলেন, হাওড় অঞ্চলের মানুষকে সারা বছর পানিবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করতে এই ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন। তবে বাস্তবতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটির শুরু থেকেই পরিবেশবাদীদের আপত্তি ছিল। তবে সে সময় সরকারের চাপে তাদের কিছু করার ছিল না। তিনি বলেন, যেহেতু ব্যয়ের বড় অংশ জমি অধিগ্রহণে হয়েছে, তাই ভবিষ্যতে বড় কোনো জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের বিতর্কিত এই প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্তকে অনেকেই সময়োপযোগী মনে করছেন। তবে ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যা সরকারি প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে আরও সতর্কতা প্রয়োজনের বিষয়টি সামনে এনে দিয়েছে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়