নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ফল, গম, আলু, পেঁয়াজ ও রসুনসহ অন্তত ২৮টি কৃষি ও খাদ্যপণ্যের স্থানীয় সরবরাহের ওপর উৎসে কর বর্তমান ০.৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে।
এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং এনবিআরের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান-সহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মিললে এটি আগামী জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল, ছোলা, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ভুট্টা, আটা, ময়দা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, খেজুর ও বিভিন্ন ফল। পাশাপাশি ধানের কুড়া, সরিষা, তিল, বীজ, কাঁচা চা-পাতা, পাটকাঠি ও পাটজাত পণ্যও কর বৃদ্ধির আওতায় আসতে পারে।
এনবিআর সূত্র বলছে, অর্থনৈতিক মন্দা, আমদানি কমে যাওয়া এবং সীমিত করজালের কারণে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। তাই বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে রাজস্ব ঘাটতি পূরণের কৌশল নেওয়া হচ্ছে। সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরবরাহ পর্যায়ে কার্যকরভাবে কর আদায় নিশ্চিত করা গেলে বছরে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পাওয়া সম্ভব।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এ সিদ্ধান্ত মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত করকে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন-এর সাবেক সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, এনবিআরের কাছে জমা হওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া কঠিন হওয়ায় ব্যবসায়ীরা করকে স্থায়ী খরচ হিসেবেই ধরে নেন। তার মতে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, ফলে নিত্যপণ্যে নতুন কর আরোপ বাজারে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এনবিআরের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও। তার মতে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতীতে কয়েক দফা এই কর কমানো হয়েছিল। এখন আবার কর বাড়ানো হলে নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
গত কয়েক বছরে নিত্যপণ্যের উৎসে কর একাধিকবার পরিবর্তন হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে করহার ২ শতাংশে উন্নীত করা হলেও পরে তা ১ শতাংশে নামানো হয়। পরবর্তীতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে তা আরও কমিয়ে ০.৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন আবার সেই হার দ্বিগুণ করার চিন্তা করছে এনবিআর।
বাজেট সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, শুধু নিত্যপণ্যে উৎসে কর নয়, আরও কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি প্রণোদনার উৎসে কর বাড়ানো, উপজেলা পর্যায়ে প্যাকেজ ভ্যাট চালু, ব্যাংক হিসাব খুলতে বিআইএন বাধ্যতামূলক করা এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যে ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি।
এ ছাড়া ব্যাটারিচালিত রিকশা ও মোটরসাইকেল নিবন্ধনে অগ্রিম আয়কর আরোপ এবং অতি ধনীদের ওপর সম্পদ কর আরোপের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে, ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচকে নতুন কর কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, তরুণদের মধ্যে ই-সিগারেট দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। তাই সরকার যদি এটি পুরোপুরি বন্ধ না করে, তাহলে অন্তত উচ্চহারে কর আরোপ করা উচিত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। কিন্তু নিত্যপণ্যে উৎসে কর বাড়ানো হলে এই দুই লক্ষ্য পরস্পরবিরোধী অবস্থানে চলে যেতে পারে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়