সকাল ৬টা। ওয়ারী থেকে বনানীগামী যাত্রায় দেখা গেল রাজধানী তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে পৌঁছাতেই চোখে পড়ে ব্যতিক্রম এক দৃশ্য—ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতি না থাকলেও লাল বাতি জ্বলতেই গাড়িগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে থেমে যাচ্ছে।
উবার চালকের ভাষায়, “এখন আর ঝুঁকি নিই না ভাই, সিগন্যাল ভাঙলেই ক্যামেরায় ধরা পড়ে মামলা হয়ে যায়।” একই সঙ্গে আশপাশের গাড়িগুলোকেও নিয়ম মেনে চলতে দেখা যায়। ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি ও জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত পুরো পথে একই ধরনের শৃঙ্খলা লক্ষ্য করা গেছে, যা কিছুদিন আগেও প্রায় অচিন্তনীয় ছিল।
রাজধানীর সড়কে এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) স্মার্ট ট্রাফিক নজরদারি ব্যবস্থা। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ) ট্রাফিক বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা ও ডিজিটাল সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। এসব ক্যামেরা ট্রাফিক আইন ভঙ্গ শনাক্ত করে সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল মামলার প্রক্রিয়া শুরু করছে।
রাজধানীর যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন নিয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। সভায় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্টরা ট্রাফিক ব্যবস্থার অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন।
নতুন এআই প্রযুক্তির কারণে এখন ট্রাফিক পুলিশের সরাসরি উপস্থিতির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমেছে। ক্যামেরার মাধ্যমে লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভাঙা, উল্টো পথে চলা, অবৈধ পার্কিং এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার মতো ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হচ্ছে। এরপর সফটওয়্যারের মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে অটো-জেনারেটেড মামলা।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কোনো ঘটনা শনাক্ত হলে তা সঙ্গে সঙ্গে সার্ভারে জমা হয় এবং বিআরটিএর নিবন্ধন তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে গাড়ির মালিককে নোটিস পাঠানো হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনি প্রক্রিয়া আরও কঠোর হতে পারে।
কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্বে থাকা এক ট্রাফিক সদস্য জানান, আগে সিগন্যাল অমান্য করে অনেক গাড়ি চলে যেত, কিন্তু এখন ক্যামেরার কারণে চালকরা নিজেরাই নিয়ম মানছেন। একই অভিজ্ঞতা জানান এক রাইডশেয়ার চালকও—তার মতে, “এখন বুঝি ক্যামেরা সব দেখছে, মামলা বাড়িতে চলে যায়।”
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, এআই ক্যামেরা চালুর প্রথম কয়েক দিনে শত শত মামলা রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভাঙা, উল্টো পথে চলা ও অবৈধ পার্কিংয়ের ঘটনা বেশি।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান জানান, প্রাথমিকভাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক অপরাধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং সব তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সার্ভারে সংরক্ষিত হচ্ছে, ফলে অস্বীকারের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই প্রযুক্তি শুধু আইন প্রয়োগ নয়, চালকদের মধ্যে একটি “ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়” তৈরি করেছে, যা আচরণগত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। তবে সচেতনতার ঘাটতি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক চালক এখনো নতুন ব্যবস্থার পুরো নিয়ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় ভুল করছেন।
ডিএমপি জানিয়েছে, কোনো নোটিস পাওয়া গেলে তা উপেক্ষা না করে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ ক্যামেরার মামলার নামে কেউ অর্থ দাবি করলে তা সরাসরি ট্রাফিক বিভাগ বা থানায় জানাতে বলা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, লাল বাতি মেনে চলা, স্টপ লাইন অতিক্রম না করা, নির্দিষ্ট লেন ব্যবহার, উল্টো পথে না চলা এবং যত্রতত্র পার্কিং এড়িয়ে চলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন যানবাহন রাস্তায় নামালে স্বয়ংক্রিয় মামলার ঝুঁকি আরও বাড়বে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়