
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের আলো ছড়ালেও বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়ীয়া ইউনিয়নের উপকূলীয় জনপদে নেমে এসেছে পরিবেশগত বিপর্যয়ের ছায়া। পায়রা ও বিষখালী নদীর মোহনার কাছে গড়ে ওঠা কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে একদিকে যেমন জলজ বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকায় দেখা দিয়েছে মারাত্মক অনিশ্চয়তা।
পায়রা ও বিষখালী নদীর মোহনা একসময় ইলিশসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছের নিরাপদ প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র ছিল। স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্য ও গরম পানি নদীতে পড়ার ফলে এবং কয়লা খালাসের সময় কয়লার গুঁড়া পানিতে মিশে মাছের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যহারে কমে গেছে। জালে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় তালতলী ও খোট্টার চর এলাকার হাজার হাজার জেলে পরিবার আজ কর্মহীন ও দিশেহারা। বাধ্য হয়ে অনেকে তাদের পৈতৃক পেশা পরিবর্তন করছেন।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের গ্রামগুলোতে—বিশেষ করে বড় অঙ্কুজান পাড়া এলাকায়—বাতাসের ধূলিকণা ও দূষণের কারণে চর্মরোগ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় নারী ও শিশুদের মধ্যে চুলকানি, ত্বকের জ্বালাপোড়া এবং এলার্জিজনিত রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশগত এই সমস্যার কারণে তরুণ-তরুণীদের দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিকভাবেও নানা বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও বালু উত্তোলনের প্রভাবে স্থানীয় বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র ‘শুভসন্ধ্যা সৈকত’সহ তীরবর্তী এলাকাগুলো নদীভাঙন ও বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর পাশাপাশি, টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও সংলগ্ন বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য কার্বন ও সালফারযুক্ত ধোঁয়া এবং ধূলিকণার কারণে মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা নিয়মিত বায়ু ও পানির মান পরীক্ষা, দূষণ রোধে কঠোর ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্বচ্ছ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধি ও গবেষকরা উপকূলীয় ভারসাম্য রক্ষায় এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের ওপর জোর দিয়েছেন।
জাতীয় উন্নয়নে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হলেও উপকূলের ভঙ্গুর প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার স্বার্থে পরিবেশগত নিয়ম কঠোরভাবে প্রতিপালন করা সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।