পবিত্র হজ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি শুধু কিছু আনুষ্ঠানিকতার সমষ্টি নয়; বরং মহান আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ, ভালোবাসা ও আনুগত্যের এক মহিমান্বিত প্রকাশ। হজের মৌসুম এলেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসল্লি ইহরামের শুভ্র পোশাকে সজ্জিত হয়ে ছুটে যান পবিত্র কাবাঘরের দিকে। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এ মহান সফরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বিদায় হজ মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।
হাদিসে বর্ণিত মহানবী (সা.)-এর হজ পালনের প্রতিটি ধাপ আজও মুসলমানদের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা হয়ে আছে। ইহরাম বাঁধা থেকে শুরু করে তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার সায়ি, আরাফায় অবস্থান, মুজদালিফায় রাত্রিযাপন এবং মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ—সব ক্ষেত্রেই তিনি বাস্তব উদাহরণ রেখে গেছেন।
মহানবী (সা.) মদিনার অদূরে যুল হুলাইফা নামক স্থানে ইহরাম বাঁধেন। বিশিষ্ট তাবেয়ি সাঈদ ইবনুল জুবায়ের (রা.) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) যুল হুলাইফার মসজিদে দুই রাকাত নামাজ আদায় করার পর তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে ইহরাম গ্রহণ করেন। (সুনানে আবি দাউদ : ১৭৭০)
ইহরাম হজযাত্রার সূচনা ধাপ। এ সময় হাজিরা পার্থিব চাকচিক্য ত্যাগ করে একান্তভাবে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করেন। শুভ্র পোশাক মানুষের মাঝে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো তালবিয়া পাঠ। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) এভাবে তালবিয়া পাঠ করতেন—
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।” (বোখারি : ১৫৩৯)
এর অর্থ, “আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই। নিশ্চয়ই সব প্রশংসা, নেয়ামত ও রাজত্ব একমাত্র আপনারই।”
হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করতেন এবং সাহাবিদেরও তা করতে নির্দেশ দিতেন। তিনি জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপের আগ পর্যন্ত তালবিয়া পাঠ অব্যাহত রাখেন। (সুনানে আবি দাউদ : ১৮১৪-১৮১৫)
মক্কায় পৌঁছে মহানবী (সা.) সর্বপ্রথম কাবা শরিফ তাওয়াফ করেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মুশরিকদের বিদ্রূপের জবাবে মুসলমানদের শক্তিমত্তা প্রদর্শনের জন্য তিনি তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে দ্রুত পদচারণা বা ‘রমল’ করেন। বাকি চার চক্কর স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করেন। (মুসলিম : ১২৬২, ১২৬৪)
বিদায় হজে মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপের পর তিনি উটনীর পিঠে আরোহণ করে তাওয়াফে জেয়ারত আদায় করেন। এতে লোকজন তাকে সহজে দেখতে ও বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞাসা করতে পেরেছিল। (মুসলিম : ২৯৪০)
তাওয়াফ শেষে মহানবী (সা.) সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী সায়ি সম্পন্ন করেন। জাবের (রা.) বর্ণনা করেন, সাফা পাহাড়ে উঠে তিনি প্রথমে সুরা বাকারার ১৫৮ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করেন। এরপর কাবার দিকে মুখ করে আল্লাহর একত্ব ও মাহাত্ম্য ঘোষণা করেন এবং দীর্ঘ দোয়া করেন। (মুসলিম : ২৮২১)
সাফা থেকে মারওয়ার পথে নির্দিষ্ট স্থানে তিনি দ্রুতগতিতে চলতেন, যা বর্তমানে সবুজ বাতি দ্বারা চিহ্নিত। এরপর মারওয়া পাহাড়ে উঠে একইভাবে দোয়া ও জিকির করতেন।
হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আরাফায় অবস্থান। ৯ জিলহজ মহানবী (সা.) মিনায় ফজর নামাজ আদায় করে আরাফার উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে তিনি ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণ প্রদান করেন, যা মানবাধিকারের এক অনন্য দলিল হিসেবে আজও সমাদৃত।
ভাষণের পর তিনি জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে আদায় করেন এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদত, দোয়া ও জিকিরে মশগুল থাকেন। সূর্য ডোবার পর তিনি মুজদালিফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। (মুসলিম : ২৮২১)
মুজদালিফায় পৌঁছে মহানবী (সা.) একই আজান ও পৃথক ইকামতের মাধ্যমে মাগরিব ও ইশার নামাজ আদায় করেন। এরপর তিনি ফজর পর্যন্ত বিশ্রাম নেন। ফজরের নামাজ আদায়ের পর মাশআরুল হারামে দাঁড়িয়ে কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর জিকির, তাওহিদ ঘোষণা ও দোয়া করতে থাকেন। দিনের আলো ছড়িয়ে পড়া পর্যন্ত তিনি সেখানে অবস্থান করেন। (মুসলিম : ২৮২১)
মুজদালিফা থেকে মিনায় এসে মহানবী (সা.) জামারায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। প্রতিটি কঙ্কর মারার সময় তিনি তাকবির বলতেন। এরপর কোরবানি সম্পন্ন করে মাথা মুণ্ডন করেন। হাদিসে এসেছে, তিনি হাজ্জামকে প্রথমে ডান পাশ ও পরে বাম পাশ থেকে চুল কাটার নির্দেশ দেন। পরে সেই চুল সাহাবিদের মাঝে বিতরণ করেন। (মুসলিম : ৩০৪৩)
কোরবানির পরবর্তী তিনদিনও তিনি নির্ধারিত সময়ে তিন জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপ করেন। প্রথম ও দ্বিতীয় জামারায় কঙ্কর নিক্ষেপের পর দীর্ঘ দোয়া করতেন, তবে জামরায়ে আকাবায় দোয়া না করে ফিরে যেতেন। (বোখারি : ১৭৫৩)
হজের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ আমল তাওয়াফে জেয়ারতও মহানবী (সা.) কোরবানির দিন সম্পন্ন করেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) মিনায় কোরবানি শেষে মক্কায় এসে তাওয়াফে জেয়ারত আদায় করেন এবং পরে মিনায় ফিরে জোহরের নামাজ পড়েন। (মুসলিম : ১৩০৮)
মুসলিম উম্মাহর জন্য বিদায় হজের প্রতিটি শিক্ষা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মহানবী (সা.)-এর দেখানো পদ্ধতিতে হজ পালন একজন মুমিনকে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির পথেই এগিয়ে নেয় না, বরং তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে তাকওয়া ও মানবতার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়