চলচ্চিত্র প্রযোজনার প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে চিত্রনায়িকা পূজা চেরী-র বাবা দেবু প্রসাদ রায়-কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গত ১৮ এপ্রিল তাকে আটক করা হয়। বর্তমানে তিনি আদালতের নির্দেশে কারাগারে রয়েছেন। প্রতারণার এই মামলাটি দায়ের করেছেন মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে অভিযুক্তের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের দাবি করেছেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে দেবু প্রসাদ রায় চলচ্চিত্র প্রযোজনার নামে মিজানুর রহমান ও তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছ থেকে ধাপে ধাপে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেন। প্রথম পর্যায়ে তিনি নগদে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা নেন। এরপর ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আরও ৫০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে ৬ কোটি টাকা নেওয়া হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আরও ১ কোটি ২০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সবশেষে ২০২৬ সালের ৩০ মার্চও বিকাশের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে এজাহারে। সব মিলিয়ে মোট ১৩ কোটি ২০ লাখ ১০ হাজার ২০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এত বড় অঙ্কের অর্থ তিনি বিশ্বাসের ভিত্তিতেই দিয়েছেন, কারণ অভিযুক্তের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের পরিচয় এবং সুসম্পর্ক ছিল।
ভুক্তভোগী মিজানুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে চলচ্চিত্র প্রযোজনার বিভিন্ন পরিকল্পনা দেখিয়ে তাকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। একাধিক সিনেমা নির্মাণের কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো প্রকল্পের অগ্রগতি দেখা যায়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টাকা ফেরতের বিষয়ে নানা অজুহাত দেওয়া হয় এবং পরে তা এড়ানোর প্রবণতা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে টাকা ফেরত চাওয়ায় তাকে ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
এ বিষয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসান জানিয়েছেন, প্রতারণার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে কারাগারে রাখা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ব্যাংক লেনদেনের নথি, স্ট্যাম্প ডকুমেন্ট এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
এই ঘটনায় চিত্রনায়িকা পূজা চেরীর নাম আলোচনায় এলেও তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ দাবি করেছেন। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, বাবার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ বা মামলার সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা নেই। বিষয়টি পারিবারিক হলেও এর বিস্তারিত তথ্য তার জানা নেই বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বিষয়টি যেহেতু আদালতে বিচারাধীন, তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তি, ব্যাংকিং প্রমাণ এবং অন্যান্য ডকুমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হলে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনগতভাবে নির্দোষ বলে বিবেচিত হন।
এদিকে, এই ঘটনার পর চলচ্চিত্র জগতে অর্থ বিনিয়োগ এবং প্রযোজনার নামে প্রতারণার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন করলে ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
বর্তমানে মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, সব দিক বিবেচনা করে প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়