সিরাজগঞ্জ শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক কাটাখালী নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সিরাজগঞ্জ পৌরসভা। নদী সংস্কার ও দুই তীরের সৌন্দর্যবর্ধনের লক্ষ্যে ১৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেট-এর অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি শহরের পরিবেশ ও নান্দনিকতায় বড় পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রকল্পের আওতায় কাটাখালী নদীর খনন ও পুনর্বাসন, নদীর দুই পাশে তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ, আধুনিক ফুটপাথ ও ওয়াকওয়ে তৈরি এবং তিনটি বড় সেতু নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি নদীর পাড়ে বসার স্থানসহ বিনোদন উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের অবহেলায় জীর্ণ হয়ে পড়া নদীটি আবারও প্রাণ ফিরে পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮০৩ সালে ব্রিটিশ নীলকুঠিয়ালরা পাট ব্যবসার সুবিধার্থে শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত বড়াল নামে একটি প্রাচীন খাল পুনঃখনন করে। তখন থেকেই এটি ‘কাটাখালী’ নামে পরিচিতি পায়। খালটির দুই প্রান্ত যমুনা নদী-এর সঙ্গে সংযুক্ত ছিল এবং নৌপথে পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীটির গুরুত্ব কমতে থাকে। ১৯৬২ সালে কাটাখালীর দক্ষিণ প্রান্তের বাঐতারা স্লুইচগেট বন্ধ হয়ে গেলে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে যমুনা নদীতে বাঁধ নির্মাণের ফলে উত্তরের মুখও বন্ধ হয়ে যায়। এতে ধীরে ধীরে নদীটি মৃতপ্রায় খালে পরিণত হয় এবং শুরু হয় দখল ও দূষণের করুণ অধ্যায়।
২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর উদ্যোগে নদীটি দখলমুক্ত করে খনন কাজ শুরু হয়। সে সময় নদীর ওপর দুটি আধুনিক সেতু নির্মাণ করা হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘টুকু ব্রিজ-১’ ও ‘টুকু ব্রিজ-২’ নামে পরিচিত। এরপর বিভিন্ন সময়ে নদী সংস্কারের নামে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হলেও টেকসই উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৯ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাটাখালীকে পুনরায় যমুনার সঙ্গে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেয় এবং বাঐতারা স্লুইচগেটের মাধ্যমে পানি প্রবাহ চালু করা হয়। ২০২১ সালের বর্ষায় স্লুইচগেট খুলে দিলে যমুনার পানি প্রবেশ করলেও স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস পরই নদীটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, নদীটির বড় অংশ এখনো ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে কাটাখালীর বুকে। বিশেষ করে রেলগেট ও বড়বাজার এলাকার মাছ-মাংস ও পশু জবাইয়ের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এছাড়া মিরপুর ও বিড়ালাকুঠি এলাকার সুতা রং কারখানার বর্জ্য নদীর পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।
প্রায় ২১.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালের মধ্যে গত তিন বছরে প্রায় ৮.৫ কিলোমিটার খনন করা হলেও নিয়মিত বর্জ্য ফেলার কারণে সেই উদ্যোগ কার্যকর হয়নি। বর্ষা মৌসুম ছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময় নদীটি মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে থাকে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আবুল কালাম বলেন, “কাটাখালীর যৌবন ফিরে পাওয়া আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। একাধিকবার খনন হলেও কোনো লাভ হয়নি। প্রতিদিনই ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে নদীটি দ্রুত ভরাট হচ্ছে এবং দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।”
অন্যদিকে, বানিয়াপট্টি এলাকার যুবক পলাশের মতে, নদী পুনরুদ্ধারের জন্য প্রথমেই বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, “নিয়মিত মনিটরিং ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সচেতনতা তৈরি না করলে কোনো প্রকল্পই সফল হবে না। পাশাপাশি নদীর দুই পাশে সৌন্দর্যবর্ধন করা হলে শহরবাসী বিনোদনের সুযোগ পাবে।”
এ বিষয়ে পৌর প্রশাসক শাহাদাত হুসেইন জানান, প্রকল্পের আওতায় রেলগেট থেকে দত্তবাড়ি সেতু পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণ, ইলিয়ট ব্রিজ থেকে দত্তবাড়ি ব্রিজ পর্যন্ত ওয়াকওয়ে তৈরি, দত্তবাড়ি ব্রিজ থেকে একডালা স্লুইচগেট পর্যন্ত খালের উন্নয়ন এবং বিভিন্ন স্থানে বসার ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া রায়পুর, মিরপুর ওয়াপদা ও জানপুর এলাকায় তিনটি বড় সেতু নির্মাণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, “১৪০ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে শুধু কাটাখালী নদী নয়, পুরো শহরের চেহারাই বদলে যাবে।”
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে কাটাখালী নদীকে নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ সিরাজগঞ্জবাসীর জন্য এক নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, জনসচেতনতা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়