ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি মস্কো সফর করেছেন। এই সফর ঘিরে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর অস্বাভাবিক নয়। রাশিয়া একটি বৈশ্বিক শক্তি এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ-এর স্থায়ী সদস্য। পাশাপাশি ২০২৫ সালের চুক্তির মাধ্যমে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে মস্কোর জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল হলো উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখা।
যদিও সামরিক উত্তেজনা স্বল্পমেয়াদে কিছু সুবিধা এনে দিতে পারে—যেমন তেলের দাম বৃদ্ধি বা ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক মনোযোগ সরে যাওয়া—তবে দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়া এসবকে টেকসই সমাধান হিসেবে দেখছে না। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ মোকাবিলায় অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা রয়ে গেছে।
রাশিয়া মনে করে, শুধুমাত্র বাহ্যিক পরিস্থিতি ইউক্রেনে তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। এ কারণে তারা স্বল্পমেয়াদি লাভের চেয়ে সংঘাত সমাধান এবং এর নেতিবাচক প্রভাব কমানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে সম্ভাব্য মানবিক সংকট, উচ্চ জ্বালানি মূল্যজনিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, আঞ্চলিক আর্থিক অস্থিরতা এবং সেখানে বিনিয়োগ করা রুশ কোম্পানিগুলোর ওপর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ইরান মনে করছে, মস্কোর অবস্থান তাদের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক চাপ মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতাকে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ন্যাটো-র ইউরোপীয় সদস্যরা এই সংঘাতে সরাসরি জড়াতে অনাগ্রহী। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোও সামরিক পদক্ষেপে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা পাচ্ছে না।
চীন বরাবরের মতোই সামরিক উত্তেজনার বিরোধিতা করছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ভারতও এই সংঘাতে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে, বিশেষ করে অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় কর্মীর কারণে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ইরান শুরুতে কিছুটা কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, যা আরাঘচির সফরের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত ভঙ্গুর। যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হামলা চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে। যদিও সাম্প্রতিক সংঘাত তাদের সামরিক ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করেছে।
রাশিয়া মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসী ভূমিকা নিয়েছে, যার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিকও হতে পারে। বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ফলে তেজস্ক্রিয় দূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করছে।
মস্কো ইরানের ওপর একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে, বিশেষ করে যেগুলো জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া আরোপ করা হয়। একইসঙ্গে তারা নৌ অবরোধসহ শত্রুতামূলক পদক্ষেপকেও সমর্থন করে না।
তবে রাশিয়া সরাসরি সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। ২০২৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী ইরান-রাশিয়া সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও এটি কোনো সামরিক জোট নয়। পাশাপাশি উপসাগরীয় অন্যান্য দেশের সঙ্গেও রাশিয়ার সম্পর্ক রয়েছে, যা ভারসাম্য বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চল অত্যন্ত জটিল এবং যুদ্ধের ফলাফল অনিশ্চিত। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব-এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ, যা এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়েছে, শুধুমাত্র সামরিক পদক্ষেপ দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান আনতে পারে না। বরং এটি নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করছে এবং ভবিষ্যতে “হাইব্রিড যুদ্ধ” বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন মডেল গড়ে তোলা। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য তাদের একটি স্থিতিশীল সময় প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনো অনিশ্চিত।
সূত্র: আল জাজিরা
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়