
তিন দেশ—সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূগোল ভিন্ন হলেও নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে এক হয়েছে দেশ তিনটি। গত ৭ আগস্ট পবিত্র মক্কা নগরীতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক নাম ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এটি ‘মক্কা চুক্তি’ নামেই বেশি আলোচিত হচ্ছে।
চুক্তিটি শুধু তিন দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ফলে এর সম্ভাব্য বিস্তার ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিকে অনেকেই ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করছেন। এর অন্যতম কারণ, চুক্তিতে ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদের মতো একটি নীতির প্রতিফলন রয়েছে। অর্থাৎ জোটের কোনো একটি সদস্য আক্রান্ত হলে সেটিকে অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে।
তবে ন্যাটোর সঙ্গে মক্কা চুক্তির একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর বড় অংশ ভৌগোলিকভাবে পরস্পরের কাছাকাছি। অন্যদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো সরাসরি স্থলসীমান্ত নেই। ফলে কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের সামরিক সহায়তা দিতে ভৌগোলিক ও লজিস্টিক বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।
ন্যাটো গঠিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলার উদ্দেশ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইউরোপের কয়েকটি মিত্র দেশ নিয়ে গড়ে ওঠা এই জোট পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক জোটে পরিণত হয়।
কিন্তু মক্কা চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে— এটি কি সত্যিই একটি কার্যকর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো হয়ে উঠবে, নাকি শেষ পর্যন্ত একটি ভূরাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
প্রায় এক দশক আগে, ২০১৫ সালের মার্চে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় সৌদি আরবের নেতৃত্বে মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে একটি সামরিক জোট গঠন করা হয়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সেটিকেও ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।
কেউ কেউ ওই জোটকে ‘সুন্নি মুসলিম জোট’ও বলেছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সেটি প্রত্যাশিত কার্যকারিতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে নতুন মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মক্কায় চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় ১০ দিন পর নিজের ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এটিকে ‘বড়’, ‘সাহসী’ ও ‘গুরুত্বপূর্ণ’ প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো কীভাবে নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলছে এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও জোরদার করছে, তা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতাদের অভিনন্দন জানান।
ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের পর বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা পাওয়া সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের এই নতুন জোট ওয়াশিংটনের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করতে পারে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও ট্রাম্পের বক্তব্যে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে দক্ষিণ এশিয়ায় দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের সংঘাত থেমেছিল এবং এতে বহু মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে।
মক্কা চুক্তি নিয়ে আলোচনায় ১৯৫৫ সালের বাগদাদ চুক্তির প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ওই জোট গঠিত হয়েছিল। এতে যুক্ত হয়েছিল ব্রিটেন, তুরস্ক, তৎকালীন শাহ-শাসিত ইরান ও ইরাক।
যুক্তরাষ্ট্র জর্ডান ও মিসরকেও জোটে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিল। তবে দেশ দুটির রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আঞ্চলিক সমীকরণের কারণে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। সৌদি আরবও বাগদাদ চুক্তির বিরোধিতা করেছিল।
পরবর্তী সময়ে ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ইরাক এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরান ওই জোট থেকে সরে যায়।
লন্ডনভিত্তিক মিডল ইস্ট আইয়ের এক বিশ্লেষণে তাই প্রশ্ন তোলা হয়েছে— মক্কা চুক্তি কি সত্যিই ‘মুসলিম ন্যাটো’, নাকি এটি আরেকটি বাগদাদ চুক্তিতে পরিণত হতে পারে?
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ মাসাদের মতে, মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রপন্থি শাসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নতুন প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই উদ্যোগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আঞ্চলিক স্বার্থও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন জোটের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে আরেক ধরনের কৌশলগত বলয় তৈরির আলোচনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত, তুরস্কের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রিস এবং সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বী সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে ইসরাইল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে।
সম্প্রতি গ্রিস ইসরাইলের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার চুক্তি করেছে। ‘অ্যাকিলিস শিল্ড’ নামে ওই উদ্যোগকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
এ ছাড়া ইসরাইল, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, গ্রিস ও সাইপ্রাসকে নিয়ে পাঁচ দেশের একটি সহযোগিতা বলয় গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। এই বলয়ে কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি সামরিক সহযোগিতা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তুরস্ক ও ইসরাইলের সম্পর্কও মক্কা চুক্তির ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরাইলি হামলার বিষয়ে আঙ্কারা ধারাবাহিকভাবে সমালোচনা করে আসছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব ও পাকিস্তান এখনো ইসরাইলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে মক্কা চুক্তি ইসরাইলের জন্যও নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক।
ইসরাইলি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, চুক্তিটি সৌদি আরব-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এবং ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গঠনের আগের পরিকল্পনাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আরও কয়েকটি মুসলিমপ্রধান দেশের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আরও ছয়-সাতটি মুসলিমপ্রধান দেশ এই চুক্তিতে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
তবে কোন কোন দেশ যোগ দিতে পারে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু জানাননি। পাকিস্তানের কর্মকর্তারা নতুন দেশগুলোর জন্য চুক্তিতে যোগদানের পথ সুগম করতে কাজ করছেন বলে জানানো হয়েছে।
তবে সব বিশ্লেষণ যে মক্কা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থরক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখছে, তা নয়। কাতারভিত্তিক মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চুক্তিটির মূল লক্ষ্য প্রতিরক্ষামূলক। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সামরিক নির্ভরতা কমানো বা বিদ্যমান প্রতিরক্ষা কাঠামো বদলে দেওয়ার সরাসরি ইঙ্গিত নেই।
বরং চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো, আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলা এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদার করা।
তবে এসব দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো ব্যাপকভাবে বিদেশি অস্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভর। ফলে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কতটা স্বাধীনভাবে গড়ে তুলতে পারে, তার ওপরও মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
মক্কা চুক্তি নিয়ে ইরানের অবস্থানও বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, মুসলিম দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে বাইরের দেশগুলোর হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করা সহজ হবে।
অনেকে তার এই বক্তব্যকে মক্কা চুক্তির প্রতি ইতিবাচক অবস্থান হিসেবে দেখছেন। তবে ইরানের কিছু রাজনীতিক সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন এই নতুন জোট নিয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে সদস্য দেশগুলোর নিজেদের আঞ্চলিক স্বার্থের কারণে।
মিডল ইস্ট আইয়ের প্রধান সম্পাদক ডেভিড হার্স্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তুরস্ক চেয়েছিল মিসরকে মক্কা চুক্তির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন করতে। কিন্তু সৌদি আরব এতে আপত্তি জানায়। কারণ মিসরের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং রিয়াদের সঙ্গে আবুধাবির আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা রয়েছে।
এ কারণে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, জোটের শুরুতেই সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব আঞ্চলিক স্বার্থ ও পারস্পরিক সমীকরণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ইরান, ইসরাইল, সৌদি আরব, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে।
একদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ইসরাইল-ভারত-সংযুক্ত আরব আমিরাত-গ্রিস-সাইপ্রাসকে ঘিরে আরেকটি সহযোগিতার বলয় শক্তিশালী হওয়ার আলোচনা চলছে।
এই বাস্তবতায় মক্কা চুক্তি কি একটি কার্যকর স্বাধীন মুসলিম নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হবে, নাকি বড় শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের অংশ হয়ে থাকবে— সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
চুক্তিতে আরও মুসলিমপ্রধান দেশ যুক্ত হলে এর গুরুত্ব বাড়তে পারে। তবে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক স্বার্থ, ভৌগোলিক দূরত্ব, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক— সবকিছুই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ।
তাই আপাতত মক্কা চুক্তিকে ঘিরে যেমন সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, তেমনি তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্নও। এটি ‘মুসলিম ন্যাটো’ হয়ে উঠবে, নাকি আরেকটি অসম্পূর্ণ আঞ্চলিক জোটে পরিণত হবে— তার উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে।