বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানির ফলে ডলারের চাহিদা বেড়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এর প্রভাব পড়ছে টাকার মান, আমদানি ব্যয় এবং সামগ্রিকভাবে দেশের মূল্যস্ফীতিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৮ শতাংশে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৮.৩ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা—বিশেষ করে মহামারি ও আন্তর্জাতিক সংঘাত—গত কয়েক বছরে ডলার সংকট তৈরি করেছে। সে সময় বাজার স্থিতিশীল রাখতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে একই ধরনের চাপ আবার তৈরি হলে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ডলারের চাহিদা বাড়ার ফলে বিনিময় হারেও চাপ তৈরি হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে প্রতি ডলার ১২১.৩৮ টাকা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা বেড়ে ১২৩ টাকার বেশি হয়েছে। যদিও রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা স্থিতিশীলতা আনলেও বাজারে চাপ এখনো রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামে। ইতিমধ্যেই চাল, ডাল, তেল, ডিমসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে।
ড. ইজাজ হোসেন বলেন, পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ না করলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। বিশেষ করে পণ্য পরিবহনে ব্যয় বৃদ্ধি খাদ্যপণ্যের দামে বড় প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে ড. মঈনুল ইসলাম মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা কঠিন।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। প্রয়োজনে বাজারে ডলার সরবরাহ বাড়ানো, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার সমন্বয়সহ বিভিন্ন নীতিগত কৌশল বিবেচনায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ পড়বে। এতে আমদানি সক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখনও অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের পরিবর্তন সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে, যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।
এ অবস্থায় অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে রাজস্বনীতি, ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা এবং মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো, পরিবহন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার তদারকি জোরদার করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়োপযোগী ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে জ্বালানি তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়