
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে প্রার্থী ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ।
এনসিপি আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারি এবং উত্তর সিটিতে আসিফ মাহমুদকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কারও প্রার্থিতা ঘোষণা করা হয়নি।
দলীয় সূত্রের দাবি, এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা অনানুষ্ঠানিকভাবে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারি ও আসিফ মাহমুদকে নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। এরই মধ্যে তারা সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এলাকায় ভোটারও হয়েছেন।
এনসিপির এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারি এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদের বিষয়ে দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে এবং এতে সম্মতিও রয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পরে দেওয়া হবে।
দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মাঠের বাস্তবতা ও বৃহত্তর নির্বাচনী সমীকরণ বিবেচনায় আগের প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো জোটের ওপর নির্ভর না করে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতিও নিচ্ছে এনসিপি।
ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারিকে সামনে আনার ক্ষেত্রে তার আগের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের কাছে পরাজিত হলেও তিনি কাছাকাছি ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মির্জা আব্বাস ৫৯ হাজার ভোট পেলেও নাসীরুদ্দীন প্রায় ৫৪ হাজার ভোট পান।
এনসিপি নেতাদের মতে, ঢাকা-৮ কেন্দ্রিক নাসীরুদ্দীনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দক্ষিণ সিটি এলাকায় একটি পরিচিতি তৈরি করেছে। ফলে তাকে প্রার্থী করা হলে সেই রাজনৈতিক ভিত্তি কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
তবে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারি জানিয়েছেন, তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন। নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে তিনি যেন ঢাকা দক্ষিণে প্রার্থী হন। ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তিনি দক্ষিণ সিটি এলাকায় ভোটার হয়েছেন বলেও জানান।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদকে সামনে আনার পেছনে তরুণ ও জেন-জি ভোটারদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এনসিপির অভ্যন্তরীণ কয়েকটি জরিপেও উত্তর সিটি এলাকায় তার অবস্থান ভালো বলে দাবি দলটির নেতাদের।
আসিফ মাহমুদ বলেন, দলের পরিচালিত কয়েকটি জরিপে উত্তরে তার অবস্থান ভালো এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারির অবস্থান ভালো পাওয়া গেছে। এ বিবেচনায় ভোটার স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে তিনি প্রার্থী হবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত দলই নেবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়ে জামায়াতেরও আলাদা রাজনৈতিক হিসাব রয়েছে। দলটির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে সাদিক কায়েমের নাম প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিত সাদিক কায়েমকে ঢাকার রাজনীতিতে সক্রিয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির।
জোট-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। ফলে এনসিপি সেখানে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারি এবং জামায়াত সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করলে একই রাজনৈতিক বলয়ের দুই দলের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হতে পারে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলও দুই দলের কৌশলে প্রভাব ফেলছে। ঢাকা উত্তরের অন্তর্ভুক্ত আটটি আসনের মধ্যে চারটিতে জামায়াত জয় পেয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণের সাতটি আসনের মধ্যে দুটি আসনে দলটি জয়ী হয়েছে। ফলে দক্ষিণে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে জামায়াত।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জামায়াত-এনসিপির মধ্যে আলোচনা চললেও এনসিপি প্রকাশ্যেই এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতির কথা জানাচ্ছে।
এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, তারা এককভাবে নির্বাচন করবেন এবং সে লক্ষ্যেই মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো হচ্ছে।
দলটি ইতোমধ্যে প্রায় ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। আরও প্রায় ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব প্রার্থীর নাম ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েও কাজ করছে দলটি।
তবে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের ভেতরে ও বাইরে এ নিয়ে আলোচনা চলছে।
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা। এরপর ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে সিটি নির্বাচনের আগে ইউনিয়ন ও পৌরসভা নির্বাচনকে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাইয়ের ক্ষেত্র হিসেবেও দেখছে।
জোট-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সরকার ও সরকারি দলের ভূমিকা কেমন হয়, তা পর্যবেক্ষণ করেও পরবর্তী সময়ে জামায়াত ও এনসিপি জোটগতভাবে নির্বাচন করবে, নাকি আলাদাভাবে প্রার্থী দেবে— সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে জামায়াতের মধ্যে উদ্বেগের কারণ দেখছেন না দলটির নেতারা। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো আলাদাভাবে নির্বাচন করবে— এমন সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, এনসিপি তাদের প্রার্থী ঘোষণা করলেও এতে জামায়াতের সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আসেনি। জোটের সিদ্ধান্তও অপরিবর্তিত রয়েছে। জামায়াতের প্রার্থীরা মাঠে কাজ করছেন এবং সময় হলে তাদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় পরিচয় বা প্রতীকে হবে না। তাই জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শরিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেবে।
তিনি বলেন, আলাদাভাবে নির্বাচন করলে জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় নির্বাচনে ভালো ফল করার সম্ভাবনা রয়েছে।
জুবায়ের আরও বলেন, ১১ দলীয় জোট মূলত জাতীয় নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল। বর্তমানে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধী দল হিসেবে যেসব কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোও ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে পরিচালিত হচ্ছে।