পাড়া-মহল্লা থেকে চায়ের দোকান কিংবা টকশোর টেবিল—সব জায়গায় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটারদের দাবি, প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি আর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে আজ থেকে পুরোপুরি জমে উঠছে নির্বাচনি মাঠ। কথা একটাই—দেখা হবে বিজয়ে।
বুধবার প্রতীক বরাদ্দ শেষ হওয়ার পর আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রচার। প্রতীক হাতে পাওয়ার পর প্রার্থীদের আবেগ আর কর্মীদের উচ্ছ্বাসেই স্পষ্ট, এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে উৎসবমুখর।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সারা দেশে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন ৩ হাজার ৪১৭ জন প্রার্থী। এর মধ্যে মনোনয়ন দাখিল করেন ২ হাজার ৫৮০ জন। যাচাই-বাছাইয়ে ৭২৫ জন বাদ পড়েন। পরে ৩০০ আসনের বিপরীতে প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৮৫৫ জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়।
রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন ৬৪৫ জন। ৯ দিনের আপিল শুনানি শেষে ৪৩৬ জন প্রার্থী পুনরায় ভোটের মাঠে ফেরেন এবং বিভিন্ন কারণে ২০৯ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়। সব মিলিয়ে চূড়ান্তভাবে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ২৯১ জন।
এরপর ১৯ ও ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন ৩০৫ জন। ফলে চূড়ান্ত লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১ হাজার ৯৭২ জন প্রার্থী।
নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত আইন অনুযায়ী, জোটভুক্ত দলগুলোকে নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে হচ্ছে। তবে ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র হিসেবেও রয়েছেন বেশ কয়েকজন আলোচিত ও হেভিওয়েট প্রার্থী। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এবং ঢাকা-৯ আসনে ‘ফুটবল’ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডা. তাসনিম জারা।
আজ থেকে শুরু হওয়া প্রচার চলবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সমর্থন চাইবেন।
ইতোমধ্যে কয়েকজন শীর্ষ নেতা প্রচার শুরু করেছেন। সিলেটে মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেন। বিকেলে মিরপুর-১০ নম্বরে জনসভার মাধ্যমে প্রচার শুরু করবেন ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম তিন নেতার মাজার ও শহিদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে প্রচার শুরু করবেন।
অনলাইন ও অফলাইন—উভয় মাধ্যমেই প্রচার চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। তবে এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত আচরণবিধি কঠোরভাবে মানতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের জন্য প্রার্থীদের সংশ্লিষ্ট আইডি, পেজ ও ই-মেইলের তথ্য আগেই রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে।
নির্বাচনি প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর, ভুয়া বা ঘৃণামূলক কনটেন্ট তৈরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতি ব্যবহার করে ভোটার প্রভাবিত করা যাবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, নারী বা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক বক্তব্যও নিষিদ্ধ।
অফলাইনে পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন। ড্রোন বা কোয়াডকপ্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ। প্লাস্টিক বা পিভিসি ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। বিদেশে কোনো ধরনের নির্বাচনি সভা বা প্রচারণাও নিষিদ্ধ।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং রাজনৈতিক দলের জন্যও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রয়োজনে তদন্তসাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আচরণবিধি মানা হচ্ছে কি না তা নজরদারিতে রয়েছে ‘নির্বাচনি অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি’। পাশাপাশি মাঠে থাকবে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “কেউ আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। আশা করি সব দল সংযত আচরণ বজায় রাখবে এবং নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হবে।”
©সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২৬
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও হুবহু ব্যবহারযোগ্য দণ্ডনীয়